পরিবহন শ্রমিক থেকে বিসিএস ক্যাডার হয়ে ওঠেন অদম্য মেধাবী শফিকুল ইসলাম

সবাই ব্যস্ত এসএসসি পরীক্ষার ফল নিয়ে। আর অদম্য মেধাবী শফিকুল ইসলাম ব্যস্ততা ট্রাকের মালামাল পরিবহনে। জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজতে হয়েছে তাকে। সময়টা ২০০৫ সাল। এসএসসির ফল প্রকাশ হয়েছে। অদম্য শফিকুলের সেই ফল জানার ফুরসতও নেই। ফলাফলের একদিন পর বাড়ি ফিরে নিজের সফলতার কথা জানতে পারেন তিনি। জানলেন এসএসসি পরীক্ষায় অভাবনীয় সফলতা এসেছে। পুরো কুড়িগ্রাম জেলায় মানবিক বিভাগ থেকে একমাত্র জিপিএ ফাইভ

পেয়েছেন তিনি। স্বপ্নটা আরো বড় হয়ে গেল। অাত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল শফিকুলের। তবে অভাবের তাড়নায় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন তখন ফুলকি দিচ্ছে। হাত বাড়িয়ে দিলেন প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী কনক চাঁপা। অদম্য ওই মেধাবীর জন্য তিনি সাত হাজার টাকা শুভেচ্ছা হিসেবে পাঠান। এর সঙ্গে মেধার যোগ্যতায় বিভিন্ন বৃত্তির টাকায় উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন শফিকুল। ২০০৭-০৮ সেশনে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। সফলতার গল্পটা দ্রুত ডানা মেলে ধরতে থাকে।

বাবা বিড়ি শ্রমিক আব্দুল খালেকের পক্ষে ছেলের উচ্চশিক্ষার খরচ যোগানোর মত কোন পয়সা-কড়ি নেই। তাই বলে দমে যাননি শফিকুল। ঢাবির বঙ্গবন্ধু হলে থেকে নতুন সংগ্রাম শুরু হয় তার। পড়াশোনার খরচ চালাতে অদম্য ওই ছাত্রটি ঢাকা শহরে লিফলেট বিলি করেছেন। কম্পিউটার অপারেটর হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। এভাবেই নিজেকে সফলতার দরজায় আস্তে আস্তে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি। স্বপ্ন তার দেশকে সেবা করা। সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের

পাঠ চুকিয়ে বিসিএসের স্বপ্নে বিভোর শফিকুল নিজেকে তৈরি করেছেন একজন যোগ্য সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে। ৩৫তম বিসিএসে চান্স পেয়ে তিনি এখন লালমনিরহাট সরকারি মাজেদা খাতুন কলেজের লেকচারার। নিজেও আলোকিত হয়েছেন। এবার আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর হয়েছেন তিনি। সমাজকে বদলে দিতে চান অদম্য মেধাবী শফিকুল। তবে তার এই পথচলার পেছনে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সমাজের বিবেকবানদের অবদানও কম না। একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক,

ক্লাস সিক্সে উঠার পর স্কুলের বেতন না দিতে পেরে শফিকুলের স্কুল ছাড়ার উপক্রম হয়েছিল। এগিয়ে এলেন একজন মহানুভব শিক্ষক; মোজাফফর স্যার। তার সহযোগিতায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র খুঁজে পান শফিকুল। স্কুলে বিনাবেতনে পড়াশোনা করার ব্যবস্থাও করে দেন ওই শিক্ষক। সহপাঠীরাও অদম্য শফিকুলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই স্কুললাইফ থেকেই। এক জোড়া প্যান্ট শার্ট দিয়ে পুরো স্কুল জীবন পার করতে হয়েছে তার। অর্থ নেই তাই স্কুলে জুতো পায়ে আসা সম্ভব ছিল না তার।

সেকারণে পেছনের বেঞ্চেই ছিল তার জায়গা। সেখানে বসেই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন বুনেছেন শফিকুল। স্কুলে নিয়ম করা হল জুতো ছাড়া কেউ ক্লাসে আসতে পারবে না। বিপাকে পড়ে যান শফিকুল। তবে শেষতক ক্লাসের সবাই মিলে এক জোড়া জুতো কেনার টাকা জোগাড় করে দেয়া হয় শফিকুলকে। সেই শফিকুলই এখন আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর হয়েছেন। তার এই সংগ্রামের পথচলায় যারা তাকে সহযোগিতা করেছেন তাদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন শফিকুল। প্রতিবেশি মাহবুবুর

রহমান লিটন চাচা, ডলার ভাই, ব্যাংকার মোজাহেদুল ইসলাম শামীম ভাই, মুক্তি আর্ট, বানিয়া পাড়ার লাবলু স্যার, কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মোজাফফর স্যার, মান্নান স্যার, মমতাজ ম্যাডামসহ আরো অনেক শিক্ষকের অবদানের কথা জানিয়েছেন শফিকুল। জীবনে চলার পথে ওই মানুষগুলোকে সঙ্গে নিয়েই থাকতে চান অদম্য শফিকুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *