সিনেমা’র গল্পকেও হার মানায় মাশরাফির প্রে’ম ও বিয়ের গল্প

মাশরাফি বিন ম’র্তুজার আড্ডাবাজি এবং বন্ধু বাৎসল্যের কথা কার না জানা। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ডানপিটে। বন্ধুদের নিয়ে হই-হুল্লোড়, চিত্রা নদীতে সাঁতার কা’টা আর ঘুরে বেড়ানোই ছিল নিত্য কাজ। এসব কিছুর মাঝেই হতো ক্রিকেট খেলা। এতবেশি ডানপিটে যে, এলাকার কোন মে’য়ের দিকে ফিরে তাকাবেন, মনের কোনে কোথাও প্রে’ম উঁকি দিবে, সে সুযোগ কোথায়! স্কুল ফাঁকি দিয়ে খেলে-বেড়ানো, বন্ধুদের নিয়ে দস্যিপনাই তো ছিল তার কাজ।

কিন্তু তবুও মাশরাফির জীবনে প্রে’ম এসেছিল। একবার নয়, দু’বার। নিজ এলাকা নড়াইলেই। প্রথম প্রে’মটি কেন যেন টিকলো না। মাশরাফিও বিস্তারিত জানাননি। দ্বিতীয় প্রে’মটিই পরিণয় থেকে প্রনয় সুত্রে আবদ্ধ হয়ে গেছে। সুমনা হক সুমি। মাশরাফির স্ত্রী’। স্কুল জীবন থেকেই মন-দেয়া নেয়া। এরপর মাশরাফির জেদের কাছেই হার মেনে দু’ই পরিবার সিদ্ধান্ত নিলেন, দু’জনের জীবনটা এক করে দেবেন।

মাশরাফি বিন ম’র্তুজার প্রে’ম কাহিনী এবং বিয়ের অসাধ’রাণ গল্পই উঠে এসেছে তাকে নিয়ে লেখা জীবনীগ্রন্থ ‘মাশরাফি’তে। ক্রীড়া সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যয় রচিত মাশরাফির এই জীবনীগ্রন্থটি ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে। সেই বইতেই ‘এবং বিবাহ’ নামক অধ্যায়ে উঠে এসেছে মাশরাফির প্রে’ম এবং বিয়ের গল্প… ‘মাশরাফি’ বই থেকে সেই গল্পটাই হুবহু তুলে ধ’রা হলো জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য…

কৌশিক তখন জাতীয় দলের সঙ্গে কেনিয়ায়। হঠাৎ ঝন ঝন করে বসার ঘরের ফোনটা বেজে উঠলো। ল্যান্ডফোনে কলের আওয়াজ শুনে নাহিদ (মাশরাফির মামা) অনুমান করলেন, এটা কৌশিকের ফোন। ছুটে গিয়ে ফোন তুলতেই কোন ভদ্রতার ধার না ধেরে বলল, ‘মামা, আমি বিয়ে করব।’

নাহিদ মামা একটু থতমত খেয়ে গেলেন। ভাগনে দুনিয়ার সবকিছুতেই তার সঙ্গে পরাম’র্শ করে, গল্প করে। কিন্তু বিয়ে-প্রে’ম-সংসারের বিষয়ে তো তাদের সেভাবে কখনো কথা হয়নি। আজকালও তাদের এসব কথা বলতে কেমন সংকোচ লাগে।

জড়তা কাটিয়ে পাল্টা বললেন, ‘সে তো ভালো কথা। দেশে আয়। মে’য়ে দেখি। ভালো মে’য়ে দেখে বিয়ে দিতে হবে তো।’ মাশরাফির কণ্ঠে যেন ভুত ভর করেছে। জেদের ভরে বলে চলেছে, ‘মে’য়ে ঠিক করা আছে। তুমি মামির সঙ্গে আলাপ করো। সে সব বলবে নে।’

‘কোথায় মে’য়ে! কার মে’য়ে! দেখতে ভালো তো?’‘অ’ত আমি বলতি পারব না। তুমি মামিরে জিজ্ঞেস করো।’ ‘আচ্ছা জিজ্ঞেস করবো নে। তুই দেশে আয়। আমি মে’য়ে দেখি।’ ‘অ’ত টাইম নেই। বিশ্বকাপ সামনে। আমি বিয়ে করে তবে বিশ্বকাপে যাব। তুমি তাড়াতাড়ি যোগাড়যন্ত্র করবা সব।’ ‘কী’ বলিস বাবা! এত তাড়াতাড়ি হয় নাকি?’ ‘হবে। তুমি চাইলে হবে। আরেকটা কাজ আছে…’-এবার কৌশিকের কণ্ঠটা কেমন যেন আরও ভীতু ভীতু শোনাল। ‘কী’?’ ‘বাবাকে রাজি করাতে হবে। আর মে’য়েদের বাড়ি রাজি করাতে হবে। এটা তোমা’র কাজ।’

‘মানে কী’! মানে কী’!’- নাহিদ সাহেব কথা শেষ করারও সুযোগ পেলেন না। ওপাশ থেকে লাইন কে’টে গেছে। নাহিদ সাহেব মা’থায় হাত বোলাতে বোলাতে এসে সোফায় বসে পড়লেন। এক গ্লাস পানি ঢক করে খেয়ে ফেললেন। ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, কী’ করতে হবে। আগে কৌশিকের মামিকে ডা’কা দরকার, ‘কুহু। কুহু।’

কৌশিকের মামি সেই ভেতরের রান্নাঘরে। শুনতে পাচ্ছেন না। নাহিদ মামা নিজেই এগিয়ে গেলেন, ‘কুহু, কৌশিক বিয়ে করতে চায়।’ কৌশিকের মামি হাসেন, ‘ভালো কথা তো। ছে’লে বড় হয়েছে। বিয়ে দিবা না?’ নাহিদ মামা আরও অসহায় হয়ে পড়েন, ‘সে তো দেবো; কিন্তু ও নাকি মে’য়ে ঠিক করে ফেলেছে? তুমি জান নাকি কিছু? দেখেছ মে’য়েকে?’

‘মে’য়েকে তো তুমিও দেখেছো।’ ‘কী’ বলো, আমি কোত্থেকে দেখবো?’ কুহু মামি আরও র’হস্যময় হাসি হাসেন, ‘রোজ দিন তোমা’র সামনে থেকে যাতায়াত করে। তুমি ভাগনের পছন্দ বুঝতে পারলে না?’ ‘র’হস্য করো না। কোন মে’য়ে বলো।’ ‘আরে আমাদের সুমী। তুমি দেখো নাই।’ ‘বলো কী’। সে তো পিচ্চি মে’য়ে।’ ‘মে’য়ে পিচ্চি নেই। তোমা’র কৌশিকের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত। এখন দেখো কী’ভাবে বিয়ে দেবে।’

‘তাই তো! তাই তো!’ নাহিদ মামা’র প্রায় কেশহীন মা’থায় চুল থাকলে আজ মনে হয় সেগুলো পড়ে যেতো। এ এক বিরাট দুশ্চিন্তা। এমনিতে দুলাভাইয়ের সঙ্গে সিরাজুল হক সাহেবের পরিবারের স’ম্পর্ক খা’রাপ না। আর ভদ্রলোক তো কয়েকবছর আগে মা’রা গেছেন। তার পরিবার, নড়াইলের অ’ভিজাত একটা পরিবার। এ পরিবার বিয়েতে রাজি না হওয়ার কারণ নেই।

কিন্তু সমস্যা হলো, এটা যে প্রে’ম! প্রে’ম শুনলেই তো দুই পরিবার বেঁকে বসবে। প্রে’মের বিয়েতে কেউ কি রাজি হয় নাকি! সবচেয়ে বড় কথা এই প্রে’ম হলো কবে? চোখের সামনে ছে’লে-মে’য়ে দুটো ঘুরে বেড়ায়। নাহিদ মামা তো কখনও টের পাননি। কবে হলো প্রে’ম?

এবার আর বসে থাকা যায় ন। জায়গায় বসে হাঁক দিলেন, ‘দুখু, দুখু।’ ‘জি’। ‘ওই পাড়ার রাজু আর অসীমক ডেকে নিয়ে আয় তো। আগে বুঝি, পানি কত দুর গড়িয়েছে।’

পানি আসলে অনেক দুর গড়িয়েছে। অনেক আগে থেকেই গড়াচ্ছে। কবে, কখন এই পানি গড়ানো শুরু হয়েছে, সে কথা অবশ্য মাশরাফি বা সুমনা হক সুমি- কেউই বলতে পারেন না। এটা সিনেমা হলে ঘটনাগুলো মিলিয়ে আম’রা একটা দৃশ্যকল্প তৈরী করে নিতে পারতাম।

কৌশিকের নানাবাড়ির সামনে থেকেই সদর রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে বই কোলে নিয়ে প্রতিদিন বিকালে প্রাইভেট পড়তে যায় সুমী। কৌশিকরা তখন রাস্তার পাশে মামা’র দোকানের সামনে বসে রাজা-উজির মা’রে। সেই সময়ই প্রে’ম হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু কৌশিকরা তখন এলাকার অ্যাংরি হিরো; মে’য়েদের দিকে ফিরে তাকানোর সময় কই!

সুমীদেরও তখন ছে’লেদের দিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই। বিশেষ করে কৌশিকদের দিকে প্রে’মভরা নয়নে তাকানোর তো কোনো কারণই নেই। তখন সময়টা হলো এলাকার বড় ভাই, স্কুলের সিনিয়র, এমনি গৃহশিক্ষকের প্রে’মে পড়ার। অন্তত সুমীর বান্ধবীরা তাই পড়ছিল ঝটপট করে। সেখানে সুমী তো মন চাইলেও একই ক্লাসে পড়া কৌশিকের প্রে’মে পড়তে পারে না।

যদিও প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় হো হো করে হাসতে থাকা কৌশিককে দেখে মাঝে মাঝে প্রে’মে পড়তে ইচ্ছে করে। ক্লাসে তো প্রায়ই যায় না। স্কুলে গিয়েই সুমী একবার ছে’লেদের বেঞ্চের ওদিকে তাকায়। দেখে, কৌশিক নেই; কোথায় নাকি খেলতে গেছে। ফলে বাড়ির পাশের ছে’লে, একই ক্লাসের ছে’লে হওয়ার পরও দেখা মেলাই ভা’র সাহেবের।

তারপরও যখন স্কুলে আসে; যেভাবে বাঁদরামি করে, মে’য়েদের টিপ্পনী কাটে, যেভাবে সবাইকে নিয়ে স্যারদের পেছনে লাগে, তাদের মনে হয় মাঝে মাঝে দস্যু ছে’লেটা খা’রাপ না। কিন্তু সমস্যা হলো, সমবয়সী ছে’লের প্রে’মে পড়া ঠিক না! তাই মনে সবই ইচ্ছে হয়; কিন্তু প্রে’মে আর পড়ে না সুমী।

সুমী প্রে’মে না পড়লে কী’ হয়; মাশরাফি প্রে’মে পড়ে। যার তার প্রে’মে পড়ে। প্রায়ই প্রে’মে পড়ে। প্রে’মে পড়ে ইন’জুরি হওয়ার কোন ব্যবস্থা থাকলে তার ইন’জুরির তালিকা আরও দীর্ঘ হতো; ভাগ্যিস এই পড়ায় হাত-পা ভাঙে না। তাই স্কুলে, রাস্তায় যে মে’য়েকে দেখে, তারই প্রে’মে পড়ে যায়।

প্রে’মে পড়া মানে অবশ্য ভালোবাসা না। সে বয়সে বাউন্ডুলে ছে’লেদের আর যা হয় আর কী’। সুন্দর চেহারা দেখলেই ভালো লাগে। মাশরাফি অবশ্য দাবি করেন, তিনি ক্লাস নাইন বা টেনে পড়া অবস্থায় খুব সিরিয়াস একটা প্রে’মে পড়েছিলেন। উচ্চ’মাধ্যমিক প্রথম বর্ষ শুরু করা অবধি নাকি সে প্রে’ম চলমানও ছিল।

ধ’রা যাক নাম তার অনামিকা; এতকাল পর ‘মাশরাফির সাবেক প্রে’মিকা’ বলে কাউকে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা অন্যায় হবে বলেই এই বিকল্প নাম খুঁজলাম। সেই প্রে’মে হাবুডুবু খেতে খেতে মাশরাফি অনামিকাকে বিয়ে করে ফেলবেন বলেও ঠিক করে ফেলেছিলেন।

কিন্তু সে প্রে’ম টিকলো না। যাকে বলে ‘ব্রেকআপ’; কী’ এক কারণে তাই হয়ে গেলো। মাশরাফির দাবি, ওই প্রে’মটা চালিয়ে গেলেও বিয়ে করা কঠিন হতো। বাসা থেকে কিছুতেই মানতো না। তাই ওই ব্রেকআপটা জরুরী ছিল। সদ্য প্রে’ম ভেঙে যাওয়ায় মাশরাফি তখন দেবদাসের মত ঘুরে বেড়ান। সময়টা সম্ভবত নিউজিল্যান্ড থেকে ইন’জুরি নিয়ে ফেরার পরের প্রায় এক বছর বিরতির সময়। ওই সময়ের আগে আগে পুরনো প্রে’মটা ভেঙে গেছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে বৈরাগির মতো ঘুরে বেড়ান মাশরাফি। মাঝে মাঝে ক্র্যাচে ভর দিয়ে কলেজে যান; পরীক্ষা দিতে হবে বলে বাড়ির চাপ আছে। বাড়ির চাপ না থাকলে পরীক্ষাও দিত না; অর্থহীন মনে হয় সবকিছু।

প্রা’ণবন্ত ছে’লেটা আর মে’য়েদের দিকে ফিরেও তাকায় না। মা’থা নীচু করে কলেজে আসে আর চুপচাপ চলে যায়। বিকেল হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। দেখে সুমীর মন খা’রাপ লাগে। কিছু বলতে পারে না- কৌশিক তো স্রেফ ক্লাসমেট; তাকে আর কী’ বলা যায়!

এদিকে মাশরাফির সামনে তখন নতুন আরেক সমস্যা। পরীক্ষা দেবে; প্রস্তুতি বলে কিছুই নেই। নোটপত্র লাগবে, সাজেশন লাগবে। কোথায় পাওয়া যায়। একদিন ক্লাসে পাশের ক্লাসে পাশের বাড়ির সুমীর সঙ্গে কথা হলো। সে বলল, তার কাছে সংক্ষিপ্ত সাজেশন এবং নোট আছে। চাইলে নিতে পারে মাশরাফি। সেদিনই কলেজ থেকে হেঁটে হেঁটে সুমীর সঙ্গে বাড়ি ফিরল। সেদিন বিকেলে আবার কী’ একটা ব্যস্ততা আছে। তাই নোট নিতে তাদের বাড়িতে আর ঢোকা হলো না। বলল, ‘সুমী, তোদের নম্বরটা দে। আমি পরে ফোন দিয়ে আসব।’

ফোন নাম্বারটা লিখে দিচ্ছে সুমী। তখনই হঠাৎ সুমীর মুখের দিকে তাকাল মাশরাফি। বুকটা ছড়াৎ করে উঠল। এতদিনের বন্ধু সুমী; ওর মুখটা এভাবে তাকিয়ে তো কখনও দেখেইনি। মুখটায় এত মায়া, মাশরাফির জন্য যেন কত ভালোবাসা জমে আছে। একটু অ’বাক হয়ে চেয়ে রইল মাশরাফি। দৃষ্টিটা কী’ভাবে যেন টের পেয়ে গেলো সুমী। লাজুক চোখে ফিরে তাকাল সে।
এটাই কি সেই প্রে’ম!

‘আজ কি কলেজে যাবি, সুমী?’ ‘যাব, তুই আসবি?’ ‘হ্যাঁ। তাহলে আসার সময় নোটটা নিয়ে আসিস।’ ‘শোন। নোটের ব্যাপার কী’ হয়েছে; ওই যে আমাদের ক্লাসের একটা মে’য়ে আছে না, লম্বা মতো। সে তো আবার প্রে’ম করে যশোরের একটা ছে’লের সঙ্গে। সেই ছে’লে এসেছিল সেদিন…’ নোটের প্রয়োজন যেন একটা উপলক্ষ মাত্র। ফোনে এমন কত অর্থহীন কথা হয়। কত অর্থহীন চোখে চেয়ে থাকা। হঠাৎ করে কলেজ ব্যাপারটাকে খুব আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে মাশরাফির। রোজই তার নোট আনতে যাওয়া চাই; নোট আনা হয় না। অনেক কিছুই হয়।

এই পর্যায়ে এসে আম’রা একটা দোটানায় পড়ে গেলাম। আম’রা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না যে, সেই প্রে’মের প্রস্তাবটা কে দিয়েছিল। প্রথম বেলায় নড়াইল গিয়ে জানা গেলো, সুমীই বুঝি কাউকে দিয়ে এই মহাজাগতিক খবরটা পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু সুমী-মাশরাফি একসঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে কথাটা শুনলেন। শুনেই মাশরাফি ‘রে রে’ করে উঠলেন, ‘নাহ। আমি প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। আমাদের এক বন্ধু ছিল; কমন ফ্রেন্ড। ওকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।’

মাশরাফি জানতেন, এক প্রস্তাবেই কাজ হবে না। মে’য়ে ‘ভাব নেওয়ার’ চেষ্টা করবে। তাই তিনিও নাকি খুব ভাব নিয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। সেই ভাবটা কী’ তা জানা গেলো না। দু’জনের হাসি দেখে অনুমান করা যায় শুধু, ভাবটা বিশেষ কিছু ছিল।

থাক না; কিছু কথা গো’পনই থাক। এসব কথা গো’পন থাকলেও, দুটো মন যে মিলে যাচ্ছে, সে খবর কী’ আর গো’পন থাকে! আর কেউ টের না পাক, নড়াইলের বিখ্যাত বন্ধুবাহিনী কয়েকদিনের মধ্যেই ধরে ফেলে, কিছু একটা কোথাও হচ্ছে। ইদানীং মাশরাফি কেমন উড়ু উড়ু করে। নদীর চেয়ে রাস্তা তাকে বেশি টানে, বাগানের চেয়ে কলেজ তাকে বেশি ডাকে। ব্যাপারটা কী’? একদিন বন্ধুরা ধরল খুব- কী’ ব্যাপার রে, কৌশিক! ইদানিং সুমীর সঙ্গে খুব গুজ গুজ করিস। ‘কিছু না, কিছু না’ বলেও পার পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত সবাইকে একটু রেখে-ঢেকে বলে দিতেই হলো। তকবে একেবারে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিল, কিছুতেই এই খবর, যেন ফাঁ’স না হয়। অন্তত নিজের পায়ের তলে মাটিটা একটু শক্ত না করে কাউকে কিছু জানাতে চায় না মাশরাফি। আড্ডা চলুক, চোখে চোখে কথা চলুক; কিন্তু ব্যাপারটার বি’স্ফোরণ ঘটাতে একটু সময় চাই।

২০০৫ সালেরই এপ্রিল মাসের শেষ দিকের ঘটনা। পরের মাসে মাশরাফি দলের সঙ্গে ইংল্যান্ড যাবে। আগামী সপ্তাহেই ঢাকা যেতে হবে। ঘরোয়া ক্রিকে’টের খেলা আছে। জাতীয় দলের ক্যাম্প আছে। এর ফাঁকে অল্প কয়েকটা দিনের জন্য নড়াইল এসেছে মাশরাফি। আসার সময় এক গাদা জার্সি নিয়ে এসেছে। শুভেচ্ছা ক্লাবের ছোটদের জন্য, নতুন নতুন যারা দলে আসছে, তাদের জন্য ৪০-৫০টি জার্সি। সারাটা বিকেল ধরে সেই জার্সি বিলানো হলো। আস্তে আস্তে ভিড় ভেঙে গেলো। রাত হয়ে গেছে। বন্ধুরাও সব উঠছে।

রাজুকে একপাশে ডাক দিলেন মাশরাফি। ফিস ফিস করে বলল, ‘চুন্নু আর অসীমকে বল থেকে যেতে। তোদের তিনজনের সঙ্গে আলাপ আছে।’ তিন বন্ধু উৎকণ্ঠা নিয়ে অ’পেক্ষা করছে। রাত গভীর হয়ে গেছে। চুন্নু জিজ্ঞেস করল, ‘কী’ হইছে কৌশিক?’
‘একটা ঝামেলা হইছে।’ ‘কী’ ঝামেলা?’ ‘আমা’র বিয়ে করতি হবে।’ ‘সে তো ভালো কথা। বাড়িতে কথা বল। সুমীদের বাসায় প্রস্তাব পাঠা। বিয়ে হোক।’ ‘নাহ, সে সময় নাই। বাড়ী থেকে কী’ করে কে জানে। আমাদের নিজেদেরই বিয়ে করতে হবে।’

তিনজনের মা’থায় যেন বাজ পড়ল। তিনজনই বোঝানোর চেষ্টা করল, এটা ঠিক হবে না। কিন্তু কৌশিক কিছুতেই রাজি নয়। পরদিন পহেলা মে। মাশরাফির চাই, সেদিনই বিয়ে করতে হবে। এমনকি কাজীও নাকি সে ভেবে ফেলেছে। এলাকার বড় ভাই, মিঠু ভাই এখন কাজি। তাকে ডাকলেই চলবে। কিছুতেই একমত না রাজুরা। শেষ পর্যন্ত মাশরাফির জেদের কাছে হার মানল তিন বন্ধু। ডেকে আনা হলো পরদিন মিঠু ভাইকে।

তারপর…। নাহ এটাও গো’পন ব্যাপার। ২০০৫ সালেল ১ মে, নড়াইলে কিছু একটা ঘটেছিল। যেটা আম’রা জানতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করেও উ’দ্ধার করা যায়নি, হারিয়ে যাওয়া সেই নথি।

গো’লাম ম’র্তুজা, রাজি নন। তার এক কথা, ‘মে’য়ে ভালো। পরিবার ভালো। সবই বুঝলাম; কিন্তু প্রে’ম করে বিয়ে করবে কেন?’ এই হয়। এই ম’র্তুজা সাহেব নিজে দারুন এক প্রে’ম করে বিয়ে করেছিলেন; কিন্তু বাবা হিসেবে ছে’লের ব্যাপার সেটা মেনি নিতে একটু যেন আ’পত্তি। তার চেয়েও বেশি আ’পত্তি মে’য়ের পরিবারের। মে’য়ের পরিবারের যত না আ’পত্তি, তার চেয়ে বেশি তাদের আত্মীস্বজনের।

সুমীর বাবা মা’রা গেছেন সেই ছোটবেলায়। মা হোসনে আরা বেগমের পরিশ্রম আর অ’ভিভাবকত্বেই মানুষ হয়েছে সুমী। আর্থিক ক’ষ্ট না থাকলেও বাবাকে না পাওয়ার ক’ষ্ট ছিল ছোটবেলায়। মে’য়েদের অবশ্য সেই ক’ষ্ট পেতে দেননি মা। আত্মীয়স্বজন এসে মাকে বোঝায়, ‘ছে’লে ক্রিকেট খেলে। কোথায় কী’ করে, তার কোনো ঠিক আছে! এমন ছে’লের হাতে মে’য়ে দেওয়া ঠিক হবে না।’ সুমী বোঝানোর চেষ্টা করে। নিজের বিশ্বা’সের কথা বলার চেষ্টা করে; কিন্তু কাজ হয় না।

পুরো ব্যাপারটা এক করতে জীবন বের হয়ে যাচ্ছে নাহিদ মামা’র। মাশরাফি তো এক ফোন করেই খালাস। এখন দুই বাড়িকে রাজি করাতে প্রা’ণ যায়। তিনি ছোটাছুটি করছেন। কথায় বলে, লাখ কথা না হলে বিয়ে হয় না। নাহিদ মামা একাই মনে হয় কোটি কথা ব্যায় করে ফেলেছেন।

এদিকে কৌশিক দেশে চলে এসেছে। সে শুরু করল জেদাজেদি। দুই পরিবার রাজি না হলে সে নাকি নিজেই বিয়ে করে ফেলবে। কখনও না খেয়ে থাকে, কখনও কথা বলে না। আবার কখনও নিজের হাত কে’টে ফেলার হু’মকি দেয়। এমন চলতেই থাকতো হয়তো। শেষ পর্যন্ত নাহিদ মামা দুই পরিবারে চরম ঘোষণাটা দিয়ে দিলেন, ‘আপনারা আপসে রাজি হলে ভালো কথা। নইলে আমি ওদের বিয়ে দিয়ে দেবো। পারলে আপনারা দুই পরিবার ঠেকাতে আসবেন।’

এই হু’মকির পর আর কথার দরকার হলো না। সিনেমা’র শেষ দৃশ্যের মতো হাসি হাসি মুখে সবাই রাজি হয়ে গেলেন। বাড়ির সামনে বিশাল সাউন্ড বক্স বসে গেলো। চরম হট্টগোলের মধ্যে বেজে উঠলো সানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *