অ’পরাধ না করেও জেল খাটার জন্য যতো ক্ষতিপূরন পাচ্ছেন জাহালম

বিনাদোষে ঋণ জালিয়াতির মামলায় তিন বছর জেল খাটার ঘটনায় পাটকলকর্মী জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। ব্র্যাক ব্যাংকে ক্ষতিপূরণের এ টাকা পরিশোধ করতে হবে। রায়ে ব্র্যাক ব্যাংককে বলা হয়েছে, রায়ের কপি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে জাহালমকে ওই ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। আর টাকা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দফতরে হলফনামা আকারে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দিতে হবে। গতকাল বিচারপতি এফ আর নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। জাহালমের ঘটনায় দুদকের যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে, সেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়ে আদালত বলেছে, আমরা এ নিয়ে একটি স্বচ্ছ চিত্র দেখতে চাই। আর ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত ৩৩ মামলায় নতুন করে তদন্তের কাজ দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।

আদালতে সোনালী ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জাকির হোসেন। ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী আনিসুল হাসান। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাসার ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এম সাইফুল আলম। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, এ ঘটনায় জাহালমের কোনো দোষ ছিল না। তবু তার জীবনের তিনটি বছর জেলে কাটাতে হয়েছে। এর ফলে তাকে তার পেশা হারাতে হয়েছে। এতে জাহালমের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবি রাখেন। তিনি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংক কোনো নথিতে জাহালমের নাম উল্লেখ করেনি বা জাহালমকে শনাক্তও করেনি। ফলে এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের কোনো দায় খুঁজে পায়নি হাই কোর্ট। তবে দুদককে হাই কোর্ট সতর্ক করে দিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন দেশের একটি সাংবিধানিক, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা। দুর্নীতি রোধ করাই যাদের প্রধান কাজ। আদালত প্রত্যাশা করে, দুদকের করা মামলায় এভাবে যেন আর কাউকে জেল খাটতে না হয়। জাহালমের এই ঘটনাই যেন হয় শেষ ঘটনা।

আদালত বলেছে, দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তার অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অনভিজ্ঞতা, অবহেলা ছিল। এ ধরনের দুর্বল কর্মকর্তাদের দিয়ে যেন কোনো তদন্ত করানো না হয়। দুদক আইনের আলোকে জাহালমের ঘটনায় দুদককে দায়ী করা না গেলেও, এ ঘটনায় দুদকের নবীন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতা, অদক্ষতা প্রতিয়মান হয়েছে। তবে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১২ সালের এপ্রিলে ৩৩টি মামলা করে দুদক। দুদক তদন্ত করে বলে, জালিয়াত চক্র সোনালী ব্যাংকের ক্যান্টনমেন্ট শাখায় আবু সালেকসহ তিনজনের হিসাব থেকে ১০৬টি চেক ইস্যু করে। চেকগুলো ১৮টি ব্যাংকের ১৩টি হিসাবে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জমা করে ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

ওই ১৮টি ব্যাংকের মধ্যে একটি হলো ব্র্যাক ব্যাংক। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলে সালেকের বদলে গ্রেফতার করা হয় টাঙ্গাইলের জাহালমকে। তাকে ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা। সে কারণে ব্র্যাক ব্যাংককে এ জরিমানা দিতে বলা হয়েছে। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাহালম সাংবাদিকদের বলেন, আমার জীবনের যে তিনটা বছর চলে গেছে, সেটা তো আর ফিরে পাব না। আমি চাই মহামান্য আদালত যে টাকাটা আমাকে দিতে বলেছেন, সেটা যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পাই। তাহলে ঋণটিন পরিশোধ করে কিছু একটা করে খেতে পারব। গত বছরের জানুয়ারিতে একটি জাতীয় দৈনিকে ৩৩ মামলায় ‘ভুল’ আসামি জেলে ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না…’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা, মামলার বাদীসহ চারজনকে তলব করে হাই কোর্ট বেঞ্চ। এ ছাড়া রুলও জারি করে আদালত। পরে একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্টরা হাজিরের পর হাই কোর্ট জাহালমকে মুক্তির নির্দেশ দেয় এবং দুদকের কাছে ঘটনার বিষয়ে হলফনামা আকারে জানতে চেয়েছে। সে আদেশ অনুসারে দুদক হলফনামা আকারে তা উপস্থাপন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *