‘বেঈমানির টাকায় কখনো সুখ আর শান্তি কেনা যায় না’

আমার স্বামী ডাঃ জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু ছিলেন একজন সৎ, মেধাবী, পরিশ্রমী, পরোপকারী এবং সাহসী পুরুষ। প্রচণ্ড বন্ধু বৎসল। আমায় যখন কেউ জিজ্ঞেস করেন মরহুম জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু আর আমার মাঝে কে বেশি ভালো মানুষ?

সবসময় আমার উত্তর- মানুষ হিসেবে টিংকু অবশ্যই আন প্যারালাল। তিনি নিঃস্বার্থ ছিলেন। কখনো নিজের কথা, নিজের স্ত্রী-সন্তানের কথা ভাবতেন না। সবসময় অন্যদের উন্নতির কথা, অন্যদের পরিবার এবং যে ভাবেই হোক তাঁদের সাহায্য করার কথা চিন্তা করতেন।

অবাস্তব মনে হলেও সত্য নিজের ভাই-বোন আর তাদের সন্তানদের নিজের সন্তানদের থেকে বেশি গুরুত্ব দিতেন, তাদের দেখ ভাল করতেন। আমি কিছু বললে জবাব দিতেন, ‘’আমি তো আছিই আমার সন্তানদের জন্য, তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য’’। মারা যেতে পারেন কিংবা বিপদ হতে পারে এই চিন্তাটা তাঁর মাথাতেই ছিল না কোন কালেও।
নিজের বিজনেস পার্টনারদের ভীষণ বিশ্বাস করতেন আর আস্থা রাখতেন। তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন বিজনেস পার্টনার কালা রাজ্জাক সবকিছু আত্মসাৎ করার পর নির্লজ্জ স্বার্থপরতায় টিংকুর সন্তানদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

আমি টিংকুর মত নিঃস্বার্থ নই। আমার সন্তান সবার আগে। হ্যাঁ, আমি অবশ্যই একজন ভালো স্ত্রী, ভালো মা’ এবং ভালো মানুষ। ভালো মেয়ে বলার সক্ষমতা হারিয়েছি বহু আগেই যখন বাবা-মা কে না জানিয়ে টিংকুকে বিয়ে করেছিলাম। উপায় ছিল না, আমার পরিবার এই বিয়েতে রাজী হত না কিছুতেই। এটা অবশ্যই অন্যায়। এর বাইরে জীবনের পুরোটা জুড়ে চেষ্টা করেছি সঠিক দায়িত্ব পালনের।

মরহুম জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু এখনকার অনেক নেতার মত লোক দেখানো কিংবা স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয় সত্যি সত্যিই বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করতেন। সারাক্ষণ বিভিন্ন জনের লেখা বঙ্গবন্ধুর জীবনী পড়তেন, সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হতেন। আমায় বঙ্গ মাতা ফজিলাতুন্নেসার জীবনের বলিদান,আত্মত্যাগ, মানুষের প্রতি তাঁর কমিটমেন্ট, স্বামীর প্রতিটি কাজের সহযোগিতার ইতিহাস পড়ে শুনাতেন।

দাম্পত্য জীবন শুরুর কিছুদিন পর থেকে আমি সকাল থেকে রাত অবধি তিন বেলা কেবল রান্না করি আর লোক খাওয়াই। একশ/দুইশ মানুষের রান্না করা আমার জন্য কোন ব্যাপারই না। পুরানা পল্টনের ১০০০ স্কয়ার ফিটের বাসায় যেমন লোকে লোকারণ্য তেমনই মগ বাজারে প্রায় ৬০০০ স্কোয়ার ফিটের চার তলা বাড়িতেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

ছেলে-মেয়ের পড়াশুনার স্বার্থে পরে স্বামীর কাছে প্রস্তাব করলাম, ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তোমার চার তলায় আসার দরকার নেই। কারণ টিংকুর সাথে থাকা লোকজনও বেড রুম পর্যন্ত চলে আসে। রাতে শোয়ার কাপড় পরে থাকা আমার অস্বস্তি হয়।

এক আর দুইতলায় চট্টগ্রামের লোকজন এসে থাকতো। পরবর্তীতে ওদের জন্য আলাদা বাবুর্চি আর পিয়ন।

৪৮ বছরের মধ্যেই টিংকুর সংক্ষিপ্ত জীবনকালের পরিসমাপ্তি। কিন্তু পুরো সময়টা মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছেন।

ফিনেন্স আর ইকনমিক্স নিয়ে পাশ করা আমার ছেলের কথায়, ‘আব্বু ব্যাংক-ব্যাল্যান্স, জমি-জমা কিচ্ছু রেখে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কারণ তুমিই ছিলে আব্বুর ইনস্যুরেন্স। তোমার মত মা’ থাকলে বাবাদের চিন্তা করার প্রয়োজন হয় না।’

আমি ওকে এতটা দায়িত্বহীন ভাবতে রাজী নই, কারণ আমি জানি টিংকু বিজনেস পার্টনারদের বিশ্বাস করেছিল, তাঁর পরিবারের মানুষদের প্রতি আস্থা ছিল, ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের বুকে জড়িয়ে নিবে।

কিন্তু নদীর মত জীবনও তার গতিপথ পরিবর্তন করে। স্বার্থপর মানুষরা কতোটা সুখে আছে জানার সাধ হয়। টিংকুর মত বড় মনের একজন মানুষের ছেলে-মেয়ের টাকা আত্মসাৎ করে দামি বাড়ি এবং গাড়িতে চড়া যায়, কানাডায় স্কারবরো আর ডাউন টাউনে বাড়ির পর বাড়িও কেনা যায় কিন্তু বেঈমানির টাকায় কখনো সুখ আর শান্তি কেনা যায় না।

টিংকুর প্রতি মানুষের যে দোয়া আর ভালোবাসা তা আমার সন্তানদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়। টিংকুর রক্ত এবং হৃদয়ের উত্তরাধিকার হিসেবে এই ভালোবাসা আর দোয়াই আমাদের অমূল্য সম্পদ।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *