যেসব জনপ্রিয় অভিনেতাদের তৈরি করেছেন সাদেক বাচ্চু

পূর্ব পাকিস্তানের বিখ্যাত মঞ্চ অভিনেতা মোহা’ম্মদ আনিস। তাঁর শিষ্য সাদেক বাচ্চু। আনিসের কাছে অভিনয় শিখেছিলেন সে সময়ের পর্দা কাঁ’পানো তারকা আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক ও আনোয়ারারা। আনিস কিভাবে গ্রুমিং করাতেন সেটা আয়ত্তে নিয়েছিলেন শুরু থেকেই।

আর খাতা-কলমে কাজে লাগালেন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। নিজ হাতে গড়েছেন নাঈম-শাবনাজ, আমিন খান, শাহীন আলম থেকে শুরু করে হালের বাপ্পী চৌধুরী কিংবা শান্তকে। অভিনয়ের এই গুরু বলেছেন নিজের গল্প।

আশির দশকের শে’ষ দিককার কথা। সাদেক বাচ্চু তখন তুমুল জনপ্রিয়। বিটিভিতে বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করে নজর কেড়েছেন। পথে-ঘাটে মানুষের কাছে নিজের অভিনয়ের প্রশং’সা শোনেন। এর মধ্যেই একদিন পরিচালক এহতেশামের ফোন পেলেন।

শিগগির দেখা করার তাগিদ দিলেন। তাঁর অফিসে গেলেন বাচ্চু। সেদিনই দারুণ এক প্রস্তাব পেলেন গুণী এই পরিচালকের কাছ থেকে। সেদিনের কথা বললেন বাচ্চু, “আমার জ্ঞান সীমিত। কতটা অভিনয় জানি সেটা নিয়েও কথা বলতে চাইনি কখনো।

এহতেশাম দাদুভাই সেদিন আমাকে একটা প্রস্তাব দিলেন, নতুন ছবি ‘চাঁদনী’র জন্য নতুন নায়ক-নায়িকা নিয়েছেন তিনি। আমার গুরুদায়িত্ব তাঁদের অভিনয়ের তালিম দেওয়ার। দাদুভাইয়ের প্রস্তাব কি আর ফেরানো যায়!

সাদেক বাচ্চুর কাছে অভিনয় শেখেননি নব্বই-পরবর্তী এমন নায়ক-নায়িকা খুব কমই পাওয়া যাবে। এহতেশামের আরেক আবিষ্কার শাবনূরও প্রথম দিকে তাঁর কাছে গ্রুমিং করেছেন। আমিন খান, শাহীন আলমরাও বাচ্চুর হাতে গড়া। অবশ্য নিজে যে এত তারকার গুরু তা কখনো জানতে দেননি মানুষকে।

‘এখন হয়তো অনেকেই স্বী’কার করবে না, আমি তাদের অভিনয় শিখিয়েছি। স’ত্যি বলতে, আমি চাই-ও না সেই স্বী’কৃতি। তবে যেটুকু নিজের মধ্যে ছিল তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। অনেক কিছু হয়তো অজান্তে তাদের কাছে শিখেছিও। এটাকে আমি আদান-প্রদান বলব।’

নাঈম-শাবনাজ, আমিন খান, শাহীন আলম, জায়েদ খান, আমান রেজা ও বাপ্পী—অনেকের ভিড়ে শিষ্য হিসেবে এঁদের নাম বলতে পছন্দ করেন বাচ্চু। এঁদের কেউ কেউ তাঁকে বাবা বলেও ডাকেন, কেউ ডাকেন আংকেল বা স্যার। এতেই দারুণ খুশি এই অভিনেতা।

গুরুকে নিয়ে বললেন চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম শিষ্য নাঈম, ‘আমি আর শাবনাজ তাঁকে আংকেল বলে ডাকি। শাবনাজের বাবাও মঞ্চে অভিনয় করতেন। বাচ্চু আংকেল ছিলেন তাঁর বন্ধু। মনে পড়ে, প্রথম ছবির শুটিং শুরুর আগে তিনি আমাদের হাতে ধ’রে শেখিয়েছিলেন কিভাবে হাঁটতে হয়, কিভাবে ক্যামেরার সামনে লুক দিতে হয়, কোন সংলাপের ডেলিভারি কিভাবে দিতে হয়।

আমি বাচ্চু আংকেলের চোখের অভিনয়টা খুব ফলো করতাম। একেকটা সংলাপ বলার সময় তাঁর চোখের ধরনটা থাকত একেক রকম। আর ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও বাচ্চু আংকেলের কোনো তুলনা হয় না।’ গুরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ শাবনাজও, ‘আংকেল আমাকে মেয়ের মতো আদর করতেন।

অভিনয়ে যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছেন ঠিক সেভাবে আমার আর নাঈমের সম্পর্কের সময়ও সাহায্য করেছেন। আমাদের বিয়ের সা’ক্ষীও তিনি। পর্দায় হয়তো বেশির ভাগ সময় তাঁকে খল চরিত্রে দেখা যায়। কিন্তু আমার দেখা ভালো মানুষদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি আমাদের পরিবারেরই সদস্য।’

বাচ্চুকে তুখোড় অভিনেতা মনে করেন সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা মিশা সওদাগর। তিনি নিজেই বেশ কিছু বিষয় শিখেছেন বাচ্চুর কাছে। সেটা অনায়াসে বাচ্চুর সামনে স্বীকারও করেন। বাচ্চু বলেন, ‘মিশার এই গুণটা খুব ভালো লাগে। সে অনেক মানুষের মধ্যেই বলে দেয়, বাচ্চু ভাই, এই ডেলিভারিটা কিন্তু আপনার কাছ থেকে নিয়েছি। খুব ভালো লাগে এসব শুনতে।’

গুরুকে মনে রেখেছেন আমিন খানও। বলেন, ‘প্রথম ছবি থেকেই বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। অভিনয়ের নানা বিষয়ে টিপস দিয়েছেন। আমি সেগুলো সাদরে নিয়েছিলাম। আমার কাছে বাচ্চু ভাই একটা ইনস্টিটিউট। এখনকার নতুনরাও যদি বাচ্চু ভাইয়ের কাছে তালিম নেয়, ওরাও উপকৃত হবে।’

বাপ্পী চৌধুরীর প্রথম ছবি ‘ভালোবাসার রং’। শুটিং শুরুর আগেই বাপ্পীকে বাচ্চুর হাতে তুলে দেন প্রযোজক আব্দুল আজিজ। বাপ্পী সেটা ভালোই মনে রেখেছেন। বলেন, ‘অনেকেই হয়তো ভালো অভিনেতা; কিন্তু সবাই ভালো শিক্ষক হতে পারেন না। তিনি দারুণ একজন শিক্ষক।

নতুন অবস্থায় অভিনয়ে বেশ জ’ড়তা ছিল আমার, সেটা কাটিয়ে উঠতে দারুণ সাহায্য করেছিলেন তিনি। এখনো শুটিং স্পটে দেখা হলে আমাকে ডেকে আদর করতেন। তিনি স’ত্যিই অ’সাধারণ।’ যে মানুষটা এত তারকার অভিনয়জীবনের প্রথম গুরু, সেই মানুষটা পাননি জাতীয় স্বীকৃতি।

ঝুলিতে জোটেনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মৃ’ত্যুর আগে এই পুরস্কার পেতে ছেয়েছিলেন গুণী এই অভিনেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *