জাতীয় দলের ক্রিকেটার এখন মাছের আড়তের শ্রমিক

ক্রিকেট বিশ্বের ধনী বোর্ডগুলোর তালিকায় বেশ উপরের দিকে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররাও বেশ মোটা অংকের বেতন পান। এমনকি বয়সভিত্তিক দলের ক্রিকেটাররাও বিসিবির বেতনের আওতাভূক্ত। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য, দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলেও এখন দু’বেলা খেতে পারেন না বরিশালের আলম খান। পরিবারের জন্য খাবার জোটাতে মাছের আড়তে কাজ করছেন তিনি।

মাশরাফী-মুশফিকদের মতো আলমও জাতীয় দলের ক্রিকেটার। তবে তফাৎ হচ্ছে তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধি দলের ক্রিকেটার। আলমের হাত ধরে দেশ-বিদেশের মাটিতে অসংখ্য জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের জন্য বহুবার সুনাম বয়ে আনলেও অর্থ, যশ, খ্যাতি বা সম্মান কিছুই পাননি তিনি।

আলম খানের দেশের বাড়ি পটুয়াখালি গলাচিপা উপজেলার কোটখালী গ্রামে। তবে আড়াই দশক আগে স্বচ্ছলতার আশায় সপরিবারে বরিশাল চলে আসেন আলমের বাবা। বর্তমানে নগরীর বটতলা বাজার সংলগ্ন এলাকায় টিনের বেড়া দিয়ে নির্মিত দুটি জীর্ণ কক্ষই এই ক্রিকেটারের বাসস্থান।

বরিশাল নগরীতে একটি ছোট খাবারের দোকান চালিয়ে পরিবারের খরচ নির্বাহ করতেন আলমের বাবা কালু খান। জন্মের তিন মাস পর দুরারোগ্য এক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন আলম। পায়ের পাতা শুকিয়ে গিয়ে বাঁকা হয়ে যায়। নয় বছর বয়স পর্যন্ত দাঁড়াতেও পারতেন না তিনি। এরপর ধীরে ধীরে দাঁড়াতে শেখেন। শুরু করেন স্কুলে যাওয়া।

স্কুলে যাওয়া আসার পথে অন্যদের ক্রিকেট খেলা দেখতেন আলম। প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে সুযোগ পেতেন না কখনো। বল কুঁড়িয়ে দেয়াই ছিল তার কাজ। তবে একদিন খেলোয়াড় কম থাকায় সুযোগ পান। তখন থেকেই শুরু ক্রিকেট ঘিরে আলমের স্বপ্ন ও পথচলা। বাবা পছন্দ না করলেও মা চুপ করে টাকা জমিয়ে ব্যাট বল কিনে দিতেন। এভাবেই এগোতে থাকেন তিনি।

২০১৫ সালের মার্চে জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল গঠনে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয় ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি)। এসময় বিসিবি, বিকেএসপি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে যৌথভাবে এক প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। সেখানে ১৫৬ জন ক্রিকেটারের মধ্য থেকে ১৫ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড তৈরি করা হয়।

বাছাইয়ে ব্যাটে-বলে দারুণ পারফর্ম করেছিলেন আলম। চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার পাশাপাশি দলের অধিনায়কও নির্বাচিত হন তিনি। আলমের নেতৃত্বে সব মিলিয়ে ১১টি ম্যাচ খেলে ৭টিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী দল। ২০১৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে এসে বর্তায়। সেসময় অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন আলম।

অলরাউন্ডার রোলে খেলা আলম দলের অন্যতম ম্যাচ উইনার। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ডান হাতি অফস্পিনে প্রতি ম্যাচেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। কয়েক বছর আগে ভারতের মাটিতে তাদের শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৫৪ বলে ১১৪ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছিলেন আলম। এর পাশাপাশি ৪ ওভার হাত ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। তিন ম্যাচ সিরিজের বাকি দুটিতে ৮ উইকেট শিকার করেছিলেন আলম। ২-১ ব্যবধানে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের পাশাপাশি ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছিলেন তিনি।

২০১৫ সালে আইসিআরসি আয়োজিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আগে শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা শাখা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। সেসময় আরো অনেক আশার কথা শোনালেও এখন তার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি।

এ ব্যাপারে দেশের এক সংবাদমাধ্যমকে আলম খান বলেন, ‘সবাই বাইরে থেকে মনে করে আমরা জাতীয় দলে খেলি, বিদেশে খেলতে যাই। অনেকে ভাবে তামিম, মুশফিকদের মতো আমরাও বিসিবি থেকে নিয়মিত বেতন পাই। কিন্তু আমাদের ভেতরের কষ্টটা কেউ দেখে না।’

‘গত পাঁচ বছর জাতীয় দলের হয়ে খেললেও পারিশ্রমিক হিসেবে এক টাকাও পাইনি। আমাদের যে কত কষ্ট করে চলতে হয় তা কেউ জানে না। এখন শঙ্কায় থাকি, টাকার অভাবে ক্রিকেটকে ঘিরে আমার সব স্বপ্ন হারিয়ে যাবে কি না।’

এই অলরাউন্ডার আরো বলেন, ‘বিভিন্ন সাফল্যের পাশাপাশি এই প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল ঠিকই দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছে। তবে এই সাফল্য বয়ে আনা প্রতিবন্ধী ক্রিকেটাররা ভালো নেই। দেশের হয়ে খেলার পড়েও আমাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

দলের ব্যাপারে আলম বলেন, ‘প্রতিবন্ধী দলে অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে। আমরা দেশের জন্য কিছু করতে চাই। ঠিকমতো জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘ অনুশীলন, খেলার সরঞ্জাম এবং মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করা হলে কেউ আমাদের থামাতে পারবে না। আমি বিশ্বাস করি অন্য খেলায় বিশ্বকাপ পাওয়ার আগেই প্রতিবন্ধী ক্রিকেতাররা বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারবে।’

এ ব্যাপারে বিসিবির ন্যাশনাল গেমস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ কাওসার বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তাদের সুযোগ-সুবিধাসহ খেলার মানোন্নয়নে ক্রিকেট বোর্ডের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে সব ধরনের খেলাই থমকে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেকটাই কঠিন ব্যাপার হবে। তবে এরপরও বিষয়টি বোর্ডের বিবেচনায় রয়েছে।’

আলমের মতো এমন আরো অনেক ক্রিকেটারই নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের মতো তাদের মুখেও হাসি ফুটবে, সংসারের অভাব ঘুচবে এটাই প্রার্থনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *