‘আম্মা তোমারে দেখতে মন চাচ্ছেগো’ মাকে ফোন করে দ’গ্ধ মাইনুদ্দিনের আকুতি

সন্তানকে খুঁজছেন মা। খুঁজছেন আর কাঁদছেন। সকাল থেকে শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে হন্যে হয়ে খোঁজ করছেন। নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বি’স্ফোর’ণের পর দ’গ্ধ হয় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মাইনুদ্দিন।

দ’গ্ধ হওয়ার পর তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিলো মা মর্জিনা বেগমের। কেউ একজন কথা বলিয়ে দিয়েছিলো। মাইনুদ্দিন বলেছিলো, ‘আম্মাগো আমার শরীর পুড়ে গেছে। ব্যা’ন্ডেজ লাগিয়েছে। আমি ভালো (সুস্থ) হয়ে যাব আম্মা। আম্মাগো, আম্মা তোমারে দেখতে মন চাচ্ছেগো।’

তারপর মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মাইনুদ্দিন আর চোখ খু’লে তা’কায়নি। আম্মা বলে ডাকেনি। এই ডাক আর কোনোদিন শুনতে পাবেন না মর্জিনা। ১২ বছরের কিশোর মাইনুদ্দিন বিদায় নিয়েছে চিরদিনের মতো।

পৌনে ১টার দিকে শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পঞ্চম তলায় কথা হয় মর্জিনার সঙ্গে। তখনও তিনি জানেন না ছেলে মাইনুদ্দিন বেঁচে নেই। হন্যে হয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। মাইনুদ্দিনের খোঁজ করেন।

না, কোথাও কোনো তথ্য পান না। এভাবে সকাল পেরিয়ে দুপুর। পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ঢুকতে আ’প্রাণ চেষ্টা

করছিলেন তিনি। আনসার সদস্যরা বাধা দেন। বা’কবিত’ন্ডার এক পর্যায়ে ঢুকতে দেন তাকে। মুহূর্তের মধ্যেই একটি চিৎকার। ‘আমার বাবা নাইগো, ও আব্বা তুমি কই গেলে..। বাবাগো, তুমিতো আমাকে দেখতে চাইলে, আমাকে না দেখে কেন চলে গেলে বাবা। বাবা এখন আমি তোমাকে কোথায় পাব। কেন চলে গেলে বাবা।’

ওয়ার্ড থেকে বের হয়েই ফ্লোরে লু’টিয়ে পড়েন মর্জিনা। তাকে বারবার টেনে তুলছিলেন সঙ্গী সুরাইয়া বেগম।

আ’হাজা’রিতে ভা’রি হয়ে উঠেছে বাতাস। মর্জিনার মতোই কাঁদছেন অনেকে। স্বামী হারিয়ে কাঁ’দছেন রুমানা। তার স্বামী

ইব্রাহিম বিশ্বাস চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কাঁ’দছেন দ’গ্ধ সংবাদকর্মী নাদিম আহমেদের স্বজনরা। কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে লু’টিয়ে পড়ছিলেন দুই বোন মুক্তা ও মৌটুসী। দুই বোনের স্বামী ইমরান ও আমজাদ দ’গ্ধ হয়েছেন। আশ’ঙ্কাজ’নক অবস্থা চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তাদের।

নি’হত কিশোর মাইনুদ্দিনের স্বজন সুরাইয়া জানান, নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকায় প্রাইম স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে লেখাপড়া করতো সে। বাবা নেই। বিউটি (১৭), হাসান (১৪) ও সবার ছোট মাইনুদ্দিন (১২)কে নিয়েই থাকেন মর্জিনা।

পোষাক কারখানায় কাজ করে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ নির্বাহ করেন। সংসার চালান। নিয়মিত নামায পড়তো কিশোর

মাইনুদ্দিন। শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামায পড়তে গিয়ে বিস্ফোরণে দ’গ্ধ হয়। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ। এই সুযোগে ধর্মীয় শিক্ষা ও নামাযে মনযোগী হয় মাইনুদ্দিন।

কথা ছিলো করোনা সং’ক্র’মণ কমে গেলে স্কুল খুলবে। স্কুলে যাবে মাইনুদ্দিন। এজন্য খাতা, কলম কিনে রেখেছিলেন মা মর্জিনা। কিন্তু তার আর স্কুলে যাওয়া হবে না। আহাজা’রি করতে করতে সে কথাই বলছিলেন মা।

বলছিলেন, ‘ও বাবা বাবাগো তুমি আর স্কুলে যাবে না। স্কুলের টিফিনের জন্য খাবার চাইবে না। তোমার বই এখন কে পড়বে আ’ব্বা, আব্বা তুমি আর কোনোদিন স্কুলে যাবে না।’

নি’হত মাইনুদ্দিনের পিতার নাম মো. মহসিন। তাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের শে’খদিমন্তি গ্রামে। প্রায় ১০ বছর যাবত নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকায় থাকে এই পরিবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *