সূর্যের আলোতে গেলে বেঁচে থাকা হবে না তাদের!

একটু আপনার চোখটা বন্ধ করে দেখু’ন তো? দেখবেন নিজেকে কতখানি অসহায় লাগে। আদতে এই পৃথিবীর আলো, প্রকৃতি আর সৌন্দর্য থেকে কোন মানুষই বঞ্চিত থাকতে চায় না।

জন্মের পর দেড় বছরের মা’থায় ‘জেরোডার্মা পিগমেন্টোসাম’ রোগে আ’ক্রান্ত হয়ে দিনের আলো দেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে ফুটফুটে দুই শি’শু—মনীমউজ্জামান ও শ্রাবণী জামান।

যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিনই এই ভাই-বোনকে সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখতে হবে। এর চেয়ে নি’র্মম আর নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কী’ হতে পারে?

রাজধানীর উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে এভাবে নি’র্মম বাস্তবতার মধ্যে দিন কা’টাচ্ছে তারেকউজ্জামান খান ও লতিফা আক্তার মনি দম্পতির এই দু’সন্তান। কারণ একটাই সূর্যের আলো তারা সহ্য করতে পারে না।

সকালের স্নিগ্ধ আলোও তাদের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণেই ঘরের চার দেয়ালের অন্ধকারেই আবদ্ধ তাদের জীবন। এছাড়া উপায়ও নেই। একটি ঘরে এসি লাগিয়ে আলো ঢোকার পথ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। বাড়ির অন্য ঘরগুলোতে দরজা, জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে। এতেই ক্ষতি হচ্ছে ওদের।

সন্তানের ক’ষ্ট সহ্য করতে পারেন না বাবা-মা। কিন্তু তাদের করার বা কী’ আছে? বাবা বলেন, “ওদের একটু ভালো রাখার জন্য পুরো বাসায় সূর্যের আলো যাতে ঢুকতে না পারে সে ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

কিন্তু ভাড়া বাড়িতে এবং আর্থিক সাম’র্থ্যের অভাবে তা করা সম্ভব হচ্ছে না। চোখের সামনে ছে’লে-মে’য়ে দুটো শুধুই ক’ষ্ট পাচ্ছে।”

তাদের বড় মে’য়ে শ্রাবণীর বয়স ১৫ বছর। আর ছে’লে মনীমের বয়সও ১০ পেরিয়ে আট হতে চললো। ওরা দুজনই জন্মের দেড় বছরের মা’থায় আ’ক্রান্ত হয় ‘জেরোডার্মা পিগমেন্টোসাম’ নামক এক বিরল জটিল রোগে।

বাবা-মা সন্তানের এমন অবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে দেশি-বিদেশের বিভিন্ন স্কিন ও চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সরণাপন্ন হন।চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই রোগের একমাত্র ক্ষতিকারক দিক হলো- সূর্যের অ’তি বেগুনি রশ্মির প্রভাব। ওরা যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিনই ওদের সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখতে হবে।

সরেজমিনে তারেকউজ্জামানের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল-দরজা জানালা লাগানো চারপাশে ভা’রী পর্দা টানিয়ে রাখা ঘরের একটি রুমে তারা দু’ভাই-বোন শ্রাবণী ও মনীম সবে ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই আমা’র দিকে তাকাতে পারছে না।দীর্ঘ সময় পর যখন তারা তাকানোর চেষ্টা করল তখন দেখা গেল, তারা আর দশজন শি’শুর মতো নয়।

এসময় তাদের চোখগুলো অস্বাভাবিক লাল হয়েছিলো। দেখলে যে কেউ হয়তো ভাবতে পারেন তাদের হয়তো চোখ নিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়, তারা আসলে বিরল রোগ জেরোডার্মা পিগমেন্টোসাম-এ আ’ক্রান্ত।

চিকিৎসকদের পরাম’র্শক্রমে তারা বাসার অন্ধকার ‍রুমেও সানগ্লাস পরে আছে। চোখের যন্ত্র’ণায় মুখ তুলে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারে না। মা’থা নিচু করে খুব আস্তে করে কথা বলে। দু’জনেরই সারা শরীরে কালো ও সাদা ছোপ ছোপ দাগ। তাদের শরীরে অসংখ্য ছোট ছোট গোটা বা মেজ হয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি তাদের চোখে ধ’রা পড়েছে ম’রণব্যাধি ক্যান্সারের জার্ম।

“ছয় ঘণ্টা পর পর তাদের চোখে কৃত্রিমভাবে পানি(রিফ্রেস টিআর) ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। যখন চোখে আলাদা পর্দা পড়ে যায়, তখন অ’স্ত্রোপচার করতে হয়। দুবার ভা’রতে নিয়ে অ’স্ত্রোপচার করা হয়েছে। ছয় মাস আগে ফলোআপে আবার ভা’রতে যাওয়ার কথা ছিল।কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে তা আর হয়ে উঠেনি বলে দীর্ঘ শ্বা’স ফেলেন তাদের বাবা-মা।

চোখের পানি মুছতে মুছতে তাদের মা জানান, দীর্ঘ চাকরি জীবনে আমাদের যা সঞ্চয় ছিলো তা এই দু’সন্তানের জন্যই ব্যয় করেছি। তাদের প্রতিবার তাদের নিয়ে ভা’রত গেলে আমাদের প্রায় ১০ থেকে ১২লাখ টাকা খরচ হয়। এতো বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয় করার মতো সাম’র্থ এখন আর আমাদের নেই বলে কা’ন্নায় ভেঙে পড়েন শি’শু দুটির মা।

তাদের বাবা সাবেক এনজিও কর্মক’র্তা জানান, “রোগটি ধ’রা পড়ার পর থেকে একদিনও নেই যে চিকিৎসকের পরাম’র্শ নিতে হয়নি বা চোখের ড্রপ ছাড়া চলেছে। ভা’রতে গেলে দুই ছে’লেমে’য়ের পাশাপাশি আমাদেরও যেতে হয়। ওদের আলো থেকে বাঁচিয়ে ভা’রত নিয়ে যাওয়া, সেখানে থাকা, অ’স্ত্রোপচার করার জন্য এতো বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করার মতো অবস্থা এখন আর আমাদের নেই।”

মনীম এর বয়স কম। ও সারা দিন রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি দিয়ে খেলে। শ্রাবণীর কোনো বন্ধু নেই। বাইরে যেতে পারে না। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলায় মন বসে না। দুজনের দিন কাটে অনেকটা একাকিত্বের মধ্যে। এবাবে আর কত সময় কাটতে পারে। বাহিরে যাবার জন্য প্রা’ণপন যু’দ্ধ করে। বায়না করে একটু বাহিরে নিয়ে যাবার জন্য। বাবা, মা বাড়ি থাকলেও সূর্যের আলোর কারণে দিনের বেলায় তাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। সন্ধ্যার দিকে যখন বাইরে সূর্যের আলো থাকে না, তখনই বাবার মোটরবাইকে মাঝে মধ্যে ঘুরতে বের হয় দুই ভাইবোন।

বড় হয়ে কী’ হবে—জানতে চাইলে মনীম জানাল সে চিকিৎসক হতে চায়। কেন চিকিৎসক হতে চায়—জানতে চাইলে বলে, “আমা’র যে লাগবে। তার ধারণা, সে চিকিৎসক হলে নিজের ও বোনের চিকিৎসা নিজেই করতে পারবে।”

শ্রাবণীকেও একই প্রশ্ন করা হলে ও চুপ করে থাকে। হয়তো সে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না। তার শরীর প্রায়ই হুট করে খা’রাপ হয়ে যায়। তখন দেয়ালে মা’থা ঠুকে বসে থাকে। মাঝে মধ্যে চোখ ঝাপসা হয়ে যেখানে-সেখানে পড়েও যায়।

অশ্রু সিক্ত চোখে তারেক জানান, তারা খুব মেধাবী কিন্তু তাদের এমন রোগের কারণ কোনো স্কুলই তাদের ভর্তি নিতে চায় না। অবশেষে বহু অনুরোধে শুধুমাত্র পরীক্ষায় অংশ নেয়া শর্তে তাদের বাসার পাশের একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে।পরীক্ষার সময় শুধু হাতে-পায়ে গ্লাফস, সানগ্লাস ও সানব্লক ক্রিম ব্যবহার করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তাদের স্কুলে যাওয়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ আছে।

তিনি আরো জানান, এ পর্যন্ত তিনবার তাদের অ’পরেশন করা হয়েছে। রাজধানীর ইস’লামীয় চক্ষু হাসপাতা’লে চিকিৎসাধীন শ্রাবণীকে পুনরায় চোখে অ’পরেশন করতে বলছেন চিকিৎসকরা।গত বছর অ’পারেশনের পর শ্রবণীর চোখে ক্যান্সার ধ’রা পড়েছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অ’পরেশন করা প্রয়োজন। ফুটফুটে এ দুই শি’শুর চিকিৎসার জন্য দ্রুত ভা’রতের চেন্নাই নিতে বলেছেন চিকিৎসকরা। চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রনালয়ে এর আগেও দু’বার তাদের নেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে নিতে মোট ১০-১২ লাখ টাকা প্রয়োজন। অ’পরেশনের পরবর্তীতে দিতে হয় থেরাপি। সেটা অ’ত্যন্ত ব্যয় সাধ্য।

বাংলাদেশে রোগটির শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা করছেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের চর্ম’রোগ বিভাগের প্রধান ডাঃ মো. জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, “এই রোগে যারা আ’ক্রান্ত হয় সূর্যের অ’তি বেগুনি রশ্মি তাদের জন্য অ’ত্যন্ত ক্ষতিকর। শরীর ড্রাই হয়ে যায়। শরীরে কালো কালো দাগ পড়ে। চোখে সমস্যা দেখা দেয়। শ্রবণশক্তি কমে যায়। আস্তে আস্তে তাদের চোখ ও চামড়ায় ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে।”

এই রোগের সুচিকিৎসা কী’ এবং তা কেমন ব্যয় সাধ্য জানতে চাইলে চর্ম’রোগ ও লেজার বিশেষজ্ঞ ডাঃ জামাল উদ্দিন বলেন, এই রোগের প্রধান চিকিৎসা হলো সূর্যের অ’তি বেগুনি রশ্মির প্রভাবমুক্ত আবাসন ব্যবস্থা। উন্নত দেশে এ রোগীদের জন্য বিশেষ আবাসন ব্যবস্থা, আল্ট্রাভায়লেট প্রট্রেকটিভ সিট, লাইট, ক্যাপসের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে তারা ভালো থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে এ রোগে আ’ক্রান্তদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ রোগটি এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে বিরল।

গত বছর অ’পারেশনের পর শ্রাবণী ও মনীমের চোখে ক্যান্সার ধ’রা পড়ে। তাই যত দ্রুত সম্ভব তাদের অ’পরারেশন করতে হবে। ফুটফুটে এ দুই শি’শুর চিকিৎসার জন্য ভা’রতের চেন্নাইয়ের শঙ্কর নেত্রনালয়ে নেয়ার পরাম’র্শও দেন । সেখানে নিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল অঙ্কের এই টাকা জোগাড় করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। যদি কোন সহৃদয় বিবেকবান মানুষ বা কোন প্রতিষ্ঠান এই দুই শি’শুর জন্য এগিয়ে আসতে পারেন তাহলে হয়ত অনেকটা দিনই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *