কিস্তিতে ঋণ করে ব্যবসা শুরু করা নারী স্বপ্ন শেষ করে দিলো করোনা

যৌতুকের দাবি মিটাতে না পেরে স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হন রুমা আক্তার (২২)। আট বছরের সংসার জীবনে তাঁর রয়েছে দুই সন্তান। এর মধ্যে দুই সন্তানকে নিয়ে যায় স্বামী। কূলকিনারা হারিয়ে সহায় সম্বলহীন রুমা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সফলতার পথ খোঁজে পাচ্ছিলেন। বিদেশি একটি গরু কিনে তা থেকে দুই বছরের ব্যবধানে আর তিনটি গরু বাড়িয়ে সঠিক পথে এগোচ্ছিলেন।

এ অবস্থায় করোনার মহামারিতে চার গরুর প্রায় ৪৫ কেজি দুধ বিক্রি করতে না পেরে পড়েছেন বেকায়দায়। ক্ষোভে কষ্টে সেই দুধ ফেলে দিচ্ছেন বাড়ির পাশে খালে। তাঁর একটাই প্রশ্ন ‘আমি কি দাঁড়াতে পারব না, করোনা কি গিলে খাইব আমার স্বপ্ন?’

এই রুমা আক্তার হচ্ছেন- ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের বালিহাটা গ্রামের রুহুল আমীনের মেয়ে। রুমা আক্তার জানান, চার বোনের মধ্যে তিনি ছোট। কর্মজীবী মা-বাবার কাছে ছোট বেলা থেকেই ঢাকায় অবস্থান করেছেন। সেখানে একটি পোশাক কারখানায় চাকরির সুবাধে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার এক যুবককে বিয়ে করেন। এক বছরের মাথায় যৌতুক লোভী স্বামীর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে চলে যান মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকে দুই বছর পর দেশে এলেও তাঁর জমানো সকল টাকা নিয়ে যায় স্বামী।

এর মধ্যে দুই সন্তানের জন্ম হলে ঢাকা ছেড়ে চলে যান স্বামীর গ্রামের বাড়িতে। আবারও স্বামীর যৌতুক চাহিদা। না দিতে পারায় চলে অমানবিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে গোপনে তালাক দেয় রুমাকে। দুই সন্তান রেখেই বাবার বাড়িতে চলে আসতে বাধ্য হন রুমা।

চোখে মুখে অন্ধকার অবস্থায় রুমা হাল ছাড়েননি। নিজের গচ্ছিত, ঘরের ফার্নিচার বিক্রি ও ঋণ করে প্রায় দুই লাখ টাকা দিয়ে কিনেন একটি বিদেশি গাভী। দুই বছরের মাথায় আরো তিনটি গরু ক্রয় করে তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। দুধ বিক্রির টাকা দিয়েই ঋণ সুদ করেও একটা স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছিলেন। জানান দিচ্ছিলেন তাঁর মতো অসহায় নারীরাও পারে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। কিন্তু বাধ সাধে করোনা। যেসব গোয়ালরা বাড়িতে এসে রুমার উৎপাদিত দুধ নিয়ে যেতেন ভালো দামে (৫০-৬০ টাকা)। তারাই এখন আর আসছে না। অর্ধেক দামে বিক্রি করার প্রস্তাব দিলে ফিরিয়ে নিচ্ছে রুমার প্রস্তাব।

গ্রামের বাজারগুলিতে কিছু দুধ নিয়ে বিক্রি করলেও অবিক্রিত থাকে প্রায় ৩০/৩৫ কেজি দুধ। গ্রামের অনেক লোকজন বাজে কথা বললে রুমার মানসিক অবস্থাও খারাপ হয়ে যায়। এ ধরনের অবস্থায় রুমা এখন দিশেহারা। তাই ক্ষোভে কষ্টে দুধ ফেলে দিচ্ছেন বাড়ির পাশে খালের মধ্যে। একদিকে গরুর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। অন্যদিকে গরুর চিকিৎসা ব্যয় মিটানো এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। যে কোনো সময় তাঁর স্বপ্নের গরুগুলো বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।

রুমার বাবা রুহুল আমীন জানান, নিজেদের ভিটে ছাড়া কোনো সম্পদ নেই। তাঁর মেয়ে স্বামী সন্তান ছেড়ে চলে আসলেও হাল ছাড়েনি। পরের ওপর তোয়াক্কা না করে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। দুধ বিক্রি করে সচ্ছলতা ফিরে আসছিল। এখন করোনার মধ্যে দুধ বিক্রি না হওয়ায় কোনো আয় না থাকায় গরু লালন-পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রুমা আক্তার বলেন, আমি কারো দ্বারস্থ হতে চাইনি। নিজের সহায় সম্বল বিক্রি করে ধারদেনা নিয়ে এগুচ্ছিলাম। কঠোর পরিশ্রম করে সফলতার পথও দেখছিলাম। এখন গত পাঁচ মাস ধরে দুধ বিক্রি করতে না পারায় ফের ধারদেনা করে গরুগুলো টিকিয়ে রাখছি। এই অবস্থায় কোনো ব্যাংক ঋণ না পেলে হয়তো অচিরেই আমার সকল স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে। আমি হয়তো পথে বসব।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *