সুশান্তের মৃত্যুকে রহস্যময় করেছে যে দশ প্রশ্ন

সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পরেই বলিউড ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যম, অনলাইন ও অফলাইনের শুরু হওয়া পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ থামছেই না। এর মধ্যে ছোট ও বড় পর্দার তারকা ও বিজেপি নেতা রূপা গাঙ্গুলি টুইটারে লেখেন, ১৫ মে থেকে ১৪ জুন, এক মাসের মধ্যে সুশান্তের ঘনিষ্ঠ তিনজন আত্মহত্যা করেন। মনোমীত গ্রেওয়াল, প্রেক্ষা মেহতা আর দিশা সালিয়ান। চতুর্থ জন সুশান্ত নিজে। এই চার মৃত্যুর সঙ্গে কারও কোনো নিখুঁত পরিকল্পনা বা গোপন রহস্য জড়িয়ে থাকতে পারে বলে সিবিআই তদন্তের দাবি তোলেন রূপা। অন্যদিকে সুশান্তের মৃত্যু নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন তুলে যাচ্ছেন অভিনয়শিল্পী পায়েল রোহাতগিসহ আরও অনেকে। তাঁদের প্রশ্নগুলো নিয়ে এই আয়োজন:

১. ১৪ জুন সুশান্তকে সর্বশেষ দেখা গেছে সকাল সাড়ে নয়টায়। আনারের জুস নিয়ে ঘরে ঢুকতে। সুশান্তের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ জানায় আনুমানিক বেলা দেড়টার দিকে। কিন্তু এর মধ্যেই দুপুর ১২টার দিকে উইকিপিডিয়ায় সুশান্তের মৃত্যুর খবর আপডেট করা হয়েছে বলে অনেকের দাবি। কে করল? কীভাবে জানল?

২. সুশান্ত যে সবুজ ওড়না দিয়ে ফ্যানে ঝুলেছেন, সেখানে কেবল সুশান্তের বাঁ হাতের ৩টি আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। কিন্তু সুশান্ত বাঁহাতি ছিলেন না, বরং ডানহাতি ছিলেন। কেবল এক হাতের ৩টি আঙুল দিয়ে কীভাবে নিজেকে ঝোলানো সম্ভব? এই সবুজ ওড়না কার? কোত্থেকে সুশান্তের ঘরে এসেছেন? তা ছাড়া সুশান্তের ঘরে কোনো চেয়ার বা টুল বা সেই জাতীয় কিছু পাওয়া যায়নি যার ওপর ভর করে সুশান্ত ফ্যানের সঙ্গে নিজেকে ঝোলাবেন। বিছানা থেকে ফ্যানের দূরত্ব এমন, যে বিছানার ওপর ভর করে ফ্যানের সঙ্গে ঝোলা বেশ কঠিন, তবে একেবারে অসম্ভব নয়।

৩. সাধারণত ঝুলে যাঁরা আত্মহত্যা করেন, তাঁদের গলায় ইংরেজি ইউ বা ভি বর্ণের দাগ তৈরি হয়। অভিকর্ষ বল ও চাপের কারণে। কিন্তু সুশান্তের গলায় ‘ও’ আকৃতির দাগ পাওয়া যায়। যে দাগটি তৈরি হয়েছে, সেটি ওড়না বা কাপড়ের বেল্টের সঙ্গে কম, বরং প্লাস্টিকের দড়ির সঙ্গে ওই দাগের মিল বেশি।বাচ্চাদের ভালোবাসতেন সুশান্ত।

৪. সাধারণত এ ধরনের আত্মহত্যার পর মৃত ব্যক্তির ঘাড়ের নির্দিষ্ট একটা হাড় ভেঙে যায়। জিব, চোখ খানিকটা বের হয়ে আসে। মুখের রং নীলাভ হয়ে যায়। পা মাটির দিকে কাত হয়ে থাকে। সুশান্তের ঘাড়ের কোনো হাড় ভাঙনি। মুখের রং বদলায়নি। জিব বা চোখও বের হয়ে আসেনি। পা–ও ঠিকঠাক ছিল। সুশান্তের লাশ বিছানায় শোয়ানোর পর ওপরের দিকে মুখ করা অবস্থায় ছিল। তবে এসব পরিবর্তন ছাড়াও এইভাবে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। সুশান্তের ঝুলন্ত অবস্থার ছবি, যেটি আত্মহত্যার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ—সেই ছবিটি দেখার দাবি জানিয়েছেন অনেকে। অনেকে বলেছেন, সুশান্তের হাতে ও চোখের ওপর দাগ ছিল। যেটি ধস্তাধস্তির সাক্ষ্য বহন করে। তা ছাড়া সুশান্ত নিয়মিত ব্যায়াম করতেন। তিনি এক হাতে তাঁর শরীরের ভার বহন করতে পারেন। যে মুহূর্তে তিনি অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছিলেন, সেই মুহূর্তে তিনি এক হাতে দড়ি ধরে নিজের শরীর উঁচু করে নিজেকে বাঁচাতে পারতেন। এটা একাবারে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। যে কারণে, যে সাঁতার জানে, সে ডুবে আত্মহত্যা করতে পারে না।

৫. সুশান্তের বাসার অতিরিক্ত চাবির সেট সুশান্তের মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অন্যদিকে সুশান্তের বাসার সিসিটিভি ঠিক তাঁর মৃত্যুর আগের রাত থেকেই বন্ধ ছিল। কেন? আর সেই চাবির গোছা কোথায়?

৬. সুশান্তের অর্থনৈতিক সংকট ছিল না। নিজের বাড়ি কেনার প্রক্রিয়া চলছিল। বেশ বড় অঙ্কের অর্থ সেই বাড়ির জন্য দেওয়া ছিল। নভেম্বরে বিয়ের পর নিজের বাড়িতে ওঠার কথা ছিল। সুশান্ত মৃত্যুর আগের রাতেও হাসিখুশি ছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করেছেন। আগের রাতে সুশান্ত যখন তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন, তখন বলেছেন, লকডাউন শেষ হলে তিনি সবার আগে তাঁর বাবার সঙ্গে দেখা করবেন। সকালে বেদানার জুস খেয়েছেন। রাঁধুনিকে দুপুরের মেনু জিজ্ঞেস করেছেন আর মোবাইলে ‘কল অব ডিউটি: মাডার্ন ওয়ারফেয়ার’ গেম খেলেছেন। যে গেমটি খুব ঠান্ডা মাথায় বুদ্ধি খাটিয়ে খেলতে হয়। সবকিছুই মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। এর ভেতর, রাতের অন্ধকারে নয়, দিনের বেলা সুশান্তের আত্মহত্যা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। অবশ্য আত্মহত্যা করবেন বলে যে অস্বাভাবিক আচরণ করতেই হবে, এমন কোনো শর্ত নেই।সুশান্ত সিং রাজপুত।

৭. সুশান্তের ‘আত্মহত্যার’ (দুটো পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট ও ভিসেরা রিপোর্ট অনুসারে) পর তাঁর লাশ কাছের লীলাবতী হাসপাতালে না নিয়ে দূরে কুপার হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে বলিউডের একাধিক তারকা, যাঁদের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে যেমন, পারভীন ববি, দিব্যা ভারতী বা জিয়া খানদের লাশ ওই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কুপার হাসপাতালের পরিচালক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মহেশ ভাটের বন্ধু। আর মহেশ ভাট ও সুশান্তের প্রেমিকা রিয়া চক্রবর্তীর সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই বলছেন, তাঁদের ভেতর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বা থাকতে পারে। সুশান্তের মৃত্যুর পর মহেশ ভাট ও রিয়া চক্রবর্তীর কিছু ঘনিষ্ঠ ছবিও ভাইরাল হয়েছে। অন্যদিকে, মৃত্যুর আগে সুশান্ত কোনো সুইসাইড নোটও রেখে যাননি। পারভীন ববির সঙ্গে মহেশ ভাটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা কে না জানে। আর মহেশ ভাট ও তাঁর ভাই মুকেশ ভাট দুজনেই আগে বলেছিলেন, সুশান্তের পরিণতিও পারভীন ববির মতো হতে পারে। কেন বলেছিলেন? কীভাবে আঁচ করেছিলেন? রিয়া চক্রবর্তীকে সুশান্তের পরিবারের সদস্যরা পছন্দ করত না। সুশান্তের মৃত্যুর পর রিয়া যখন কুপার হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন সুশান্তের বোনেরা তাঁকে সুশান্তের অন্তিম সৎকার অনুষ্ঠানে আসতে নিষেধ করে।

৮. সুশান্ত ইনস্টাগ্রামে মহেশ ভাটকে অনুসরণ করতেন না। কিন্তু সুশান্তের মৃত্যুর পর তাঁর আইডি মহেশ ভাটকে অনুসরণ করছে। কে সুশান্তের আইডি চালাচ্ছে?সুশান্ত সিং রাজপুত।

৯. ছয় মাস আগে রিয়াই সুশান্তকে অবসাদের কথা বলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান ও বাসা বদল করান। ৯ জুন রিয়া চক্রবর্তী সুশান্তের বাসা থেকে বের হয়ে আসেন। এর ৩ দিন আগে ৬ জুন রিয়া চক্রবর্তী ইনস্টাগ্রামে লাল রঙের পোশাক পরা একটা ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, ‘আনলক, আনউইন্ড, আনটাই, ও ডার্লিং, ইউ উইল ফ্লাই।’ এটা একটা খুব সাধারণ কো-ইনসিডেন্স। তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। তা ছাড়া সুশান্তের ৩টি কোম্পানির পার্টনার ছিলেন রিয়ার ভাই শৌভিক চক্রবর্তী। আর একটি কোম্পানি ছিল রিয়ার নামে। যদিও রিয়া বা তাঁর ভাই কারও এক পয়সা বিনিয়োগ ছিল না। সুশান্তের বাসায় সন্দীপ সিং নামে সুশান্তের এক বন্ধুও থাকত। রিয়া চাইতেন না, সে সুশান্তের বাসায় থাকুক। এমনকি এই নিয়ে সুশান্ত আর রিয়ার মনোমালিন্যের কারণে সন্দীপ সুশান্তের আত্মহত্যার ঘটনার কিছুদিন আগে বাসা ছেড়ে চলে যান।

১০. সুশান্ত মৃত্যুর আগে ছয় মাসে ৫০টি মোবাইলের সিম বদলান। কিন্তু কেন?এগুলো কেবলই কিছু প্রশ্ন। বেশ কিছু মানুষ মুম্বাই পুলিশের কাছ থেকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাইছে ও সিবিআইয়ের তদারকির দাবি জানাচ্ছে। ওপরের তথ্যগুলো পায়েল রোহাতগির ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিও, একাধিক ইউটিউব তারকার ভিডিও, ফিল্মি ইন্ডিয়া, ই টাইমস, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনসাইডসহ বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতিবেদন থেকে নেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *