জামালপুরে নতুন এলাকা প্লাবিত, পানিবন্দী ৭০ হাজার মানুষ

ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে যমুনা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের সরিষাবাড়ি, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও মেলান্দহ, মাদারগঞ্জে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত এলাকার জনসাধারণ তাদের গৃহপালিত পশু গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস-মুরগি এবং শুকনো খাবার নিয়ে উঁচু স্থান এবং আশ্রয়কেন্দ্রে উঠছে।
রোববার (২৮ জুন) রাত ৮টা পর্যন্ত উপজেলার ১৩টি ইউপির ৫৩টি গ্রামের ১৫ হাজার ২২৪টি পরিবারের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী।

তিনি আরো বলেন, জেলার ৪৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা-নেয়ার জন্য ইঞ্জিনচালিত ১২টি নৌকা রাখা হয়েছে।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পানি পরিমাপক (গেজ রিডার) আব্দুল মান্নান জানান, বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে রাত ৮টা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত চারদিন ধরে বন্যার পানি দ্রুত বাড়ছে। এদিকে পানি বৃদ্ধির কারণে নদীপাড়ের নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে এবং প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী ইউপির চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জানান, যমুনার চরে জেগে উঠা সাপধরী ইউপির নতুন চরাঞ্চলে আষাঢ় মাসেই অতিরিক্ত বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে প্রজাপতিচর, চরশিশুয়া, চরনন্দনেরপাড়া, আমতলী, কাশারীডোবাসহ এসব চরাঞ্চলের ৩ হাজার বাড়ি-ঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

চিনাডুলি ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম জানান, এ বছরের আগাম বন্যায় নিম্নাঞ্চল এলাকায় রাস্তাঘাটে যাতায়াত বন্ধ এবং যমুনা চরাঞ্চলে বন্যা কবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ৪ হাজার পরিবারের প্রায় ৮ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

ইসলামপুরের বেলগাছা ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানান, যমুনার বুকে জেগে ওঠা খোলাবাড়ী, বরুল, মন্নিয়া ও বেলগাছায় কৃষকের পাট ও ধানখেত তলিয়ে গেছে।

ইসলামপুর ইউএনও মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সবাইকে নিয়ে বন্যা মোকাবিলায় কাজ করা হবে।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জামাল আব্দুন নাছের বাবুল জানান, যমুনায় খুব দ্রুত গতিতে পানি বাড়ছে। সেই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদীর পানিও বাড়ছে। বন্যা মোকাবিলায় উপজেলা পরিষদ প্রস্তুত রয়েছে।

জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী জানান, এরই মধ্যে ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জের বন্যার্ত এলাকায় ২০ মেক্ট্রিক টন জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে এবং ত্রাণ সামগ্রী হিসেবে ৩৫০ মেক্ট্রিক জিআর চাল, ৭ লাখ টাকা ও ২ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট চেয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরে আবেদন পাঠানো হয়েছে।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এনামুল হাসান জানান, উপজেলার ৮টি ইউপির সমস্ত নিম্নাঞ্চলগুলো বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। আখ, পাটসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় আক্রান্ত মানুষদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অনেকে গবাদিপশু এবং পরিবার নিয়ে বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।

ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান টিটু জানান, উপজেলার ৫টি ইউপির ৩২টি গ্রামের ৭ হাজার ৮৭০টি পরিবারের প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৫ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সরকারিভাবে ১০৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া পানিবন্দী মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ, শুকনো খাবার, ওষুধ সামগ্রী মজুদ রয়েছে।

সরিষাবাড়ি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগুলোর ফসলি জমিতে ভুট্টা, তিল, বাদাম, আখ, পাটসহ বিভিন্ন সবজির আবাদি জমিতে বন্যার‍ পানি প্রবেশ করেছে। এছাড়াও পোগলদিঘা, আওনা, পিংনা, কামরাবাদ, ভাটারাসহ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আওনা, কুলপালচর, স্থল, উল্লাহ কুমারপাড়া, বিলচতল, বাড়উকান্দি, কুমারপাড়া, নলসন্ধ্যা, মিরকুটিয়া, কাজলগাঁও, দমোদরপুর, চর পোগলদিঘা, কালিপুর, শ্যামপুর, মালিপাড়া, বিন্নাফৈর, টাকুরিয়া, মানিক পোটল, গোবিন্দ পোটল, চর সরিষাবাড়ি, চর নান্দিনা, আদ্রা, ছাতারিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে।

এরমধ্যে আওনা, কুলপালচরের শত শত একর তিল, বাদাম, পাটসহ ভুট্টার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘুই চরের বিটলের ৩ বিঘা পাকা ভুট্টাখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। একই গ্রামের ফজলুল হকের ৪ বিঘা, সাইফুলের ২ বিঘা, ওসমান, দুলাল, কামালসহ অনেকের ভুট্টাখেতে এখন পানি আর পানি।

কুলপালচরের ইলিয়াস সরকার জানান, পাকা তিল পানিতে চোখের সামনে তলিয়ে গেল। এ বছর ৮ বিঘা জমিতে তিল বুনে ছিলাম। আর এক সপ্তাহ পরে পানি আসলে কোনো ক্ষতি হতো না। একই কথা জানান, জাহিদ, খোকন, বেলাল, ইব্রাহিম, ফজল, বারেক, সরেয়ার, মনোয়ার, আনোয়ার, ছানোয়ারসহ শত শত কৃষক।

লেবু মিয়া জানান, আগাম বন্যায় আমার ৩ বিঘা জমির পাট তলিয়ে গেছে। দ্রুত পানি বৃদ্ধির ফলে পুরো ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের যে পরিমাণ ক্ষতি হলো তা কাটিয়ে উঠা খুবই মুশকিল। এছাড়াও জামাল, সেজাব, দুদু, সালাম, কালাম, ঠান্ডু, বেলাল, রফিকসহ হাজার হাজার একর কৃষকের পাটখেত তলিয়ে গেছে।

পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বকশিগঞ্জে নতুন করে আরো ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলায় সাধুরপাড়া, মেরুরচর, নিলক্ষিয়া ও বগারচর ইউপির ২৫টি গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে করে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১৫৭৫ হেক্টর জমির পাট, ১৩০ হেক্টর আউশ ধান, ১৭৭ হেক্টর সবজি, ১৭ হেক্টর বীজতলা ও ২ হেক্টর জমির বাদাম।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাইদ জানান, পানি বাড়ছে দ্রুত গতিতে। আরো দু-একদিন একই গতিতে পানি বাড়বে। বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা। তারা প্রস্তুত রয়েছে।

ডিসি মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, যমুনা নদীর পানি বাড়তে থাকায় বন্যার পূর্বাভাস পেয়েই জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা করা হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় ওইসব এলাকার মানুষদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা ও ত্রাণসহায়তাসহ সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তাদেরকেও প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাড়িতে পানি উঠায় জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে থাকা বন্যার্তদের খোঁজ খবর নিতে এরমধ্যেই উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *