প্রায় চিকিৎসা বঞ্চিত ক্যান্সার, হার্ট, কিডনি এবং লিভারের রোগীরা

গত দুমাস ধরে দেশে একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের সরবরাহ না থাকায় ক্যান্সার, হার্ট, কিডনি এবং লিভারের সমস্যায় ভোগা রোগীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। ফলে কার্যত বন্ধ রয়েছে তাদের চিকিৎসা।

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর শাহাবুদ্দিন কিডনি রোগ এবং প্রোস্টেট ক্যান্সারে ভুগছেন। এ ছাড়াও, তার রক্তস্বল্পতা রয়েছে। যা তার ক্যান্সার হাড়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়। প্রায় মাসখানেক আগে তাকে হাড় স্ক্যান করতে বলেছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু এখনো তিনি তা করতে পারেননি।

জাহাঙ্গীর শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘সব হাসপাতালের একই কথা, তারা আবার কবে হাড় স্ক্যান করতে পারবে তা বলতে পারছে না। আমি সত্যিই আশঙ্কায় আছি যতদিনে পরীক্ষা করতে পারব, ততদিনে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। রোগটি হয়তো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’

এই মুহূর্তে চিকিত্সা ঝুঁকিতে থাকলেও এই পরীক্ষাগুলো করা সম্ভব হচ্ছে না কোনো রোগীর পক্ষেই।

শারমিন সুলতানা সম্প্রতি স্তন ক্যান্সারের চিকিত্সা নেওয়া শুরু করেছেন। ক্যান্সার হাড়ের দিকে বেড়েছে কী না তা দেখার জন্য চিকিৎসক তাকে হাড় স্ক্যান করতে পরামর্শ দেন। তার পরবর্তী চিকিত্সায় করণীয় নির্ধারণে এটা প্রয়োজন। ঈদের দু’সপ্তাহ আগে অস্ত্রোপচারের পরে শারমিন সুলতানা হাড় স্ক্যান করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

নিউক্লিয়ার মেডিসিন প্রক্রিয়ায় ৮০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় টেকনেটিয়াম-৯৯এম বা টিসি-৯৯এম নামে পরিচিতি এই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। হাড় স্ক্যানের পাশাপাশি ক্যান্সার রোগী শনাক্ত করার জন্য ইমিউনোসিন্টিগ্রাফি ও সেন্টিনেল নোড বায়োপসি, কার্ডিয়াক রোগীদের মায়োকার্ডিয়াল পারফিউশন ইমেজিং ও কার্ডিয়াক ভেন্ট্রিকুলোগ্রাফি, ফাংশনাল ব্রেইন ইমেজিং, ব্লাড পুল লেবেলিং এবং কিডনি ও লিভারের রোগীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষায় এটি ব্যবহার করা হয়।

২০১৪ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৫ লাখেরও বেশি ক্যান্সার রোগী রয়েছেন।

সারাদেশের সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালাইড সায়েন্সেসের (আইএনএমএএস) অধীনে ১৪টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা করা হয়।

এ ছাড়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) অবস্থিত এনআইএনএমএএস এই পরীক্ষা করে।

এই ১৫টি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি কমিশন। সেই সঙ্গে কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার এই পরীক্ষাগুলো করতে পারে। তবে বর্তমানে টিসি-৯৯এম এর সরবরাহ না থাকায় সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানই রোগীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে।

মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট স্থগিত হওয়ার পর, বিশেষ করে তুরস্কের উড়োজাহাজগুলো, বাংলাদেশ টিসি-৯৯এম আমদানি করেনি।

বিএইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সানোয়ার হোসেন জানান, নিয়মিত কার্গো ফ্লাইটে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বহন করা যায় না বলে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তুরস্ক থেকে বিশেষ কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে আমদানি করা হয়।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এই ফ্লাইটগুলো স্থগিত করা হয়েছে। আমরা প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও এই আইসোটোপ আমদানি করতে পারি না। কারণ তারা নিজের জন্যই পর্যাপ্ত পরিমাণে উত্পাদন করতে পারে না।’

বিশেষজ্ঞরা জানান, আইসোটোপ ১০ থেকে ১৪ দিন সংরক্ষণ করা যায়। যার কারণে এই আইসোটোপ দিয়ে পরিচালিত পরীক্ষা এপ্রিলের শুরু থেকেই বন্ধ রয়েছে।

সাভারে অবস্থিত বিএইসি-র গবেষণা চুল্লিটি প্রয়োজনীয় আইসোটোপ তৈরি করতে সক্ষম নয় জানিয়ে ডা. সানোয়ার বলেন, ‘চুল্লিটি শুধু আইসোটোপকে চিকিত্সার জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা শুরু করতে আমাদের কমপক্ষে আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।’

কীভাবে এই অতি প্রয়োজনীয় সরবরাহ স্বাভাবিক করা যায় তা নিয়ে বিএইসি আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কমিশনই কেবলমাত্র দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি অনুমোদিত পরীক্ষাগারে আইসোটোপ সরবরাহ করে।

২ জুন যোগাযোগ করা হলে ডা. সানোয়ার বলেছিলেন, পরীক্ষা শুরু করতে আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এই পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হয়নি।

কিন্তু, রোগীরা চিকিত্সা নিয়ে হতাশ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

আইএনএমএএস ঢাকা বা বিএইসি এর ওয়েবসাইটে এ মুহূর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপাদান না থাকার বিষয়ে কোনো ঘোষণা নেই।

এনআইএনএমএএস আগে সপ্তাহে তিন দিন বিএসএমএমইউতে হাড় স্ক্যান করত।

বিএসএমএমইউর নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুন্নাহার জানান, পরীক্ষার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে চাচ্ছেন বা পুনরায় পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন তাদের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে।

ডা. নুরুন্নাহার গত ২৭ মে বলেন, ‘আমরা আমাদের রোগীদের বর্তমান অবস্থা বোঝার জন্য বেশ বেগ পাচ্ছি। এই পরিস্থিতিতে তাদের অপেক্ষা করতে বলা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারছি না।’

তিনি ধারনা করছেন যে, জুনের শেষের দিকে ছাড়া টিসি-৯৯এম ব্যবহার করে পরীক্ষা পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে না।

আইসোটোপ আমদানি করার পর তা হাসপাতালে বিতরণ করার আগে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে।

তিনি যোগ করেন, ‘বাস্তবতা হলো আমরা এগুলো এখনও আমদানি শুরু করিনি। সময় লাগবে এবং এর জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *