একটি চৌকিতেই ওদের ঘর-সংসার

বসতভিটা নেই আলপনার। তাই দুই সন্তান ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে সংসার পেতেছেন একটি চৌকিতে। চৌকির সাথে বাঁশের খুটি বেঁধে পলিথিন ও ছেড়া কাপড় দিয়ে মুড়ে তৈরি করেছেন তাদের ‘থাকার বাড়ি’। তাও আবার অন্যের বাড়ির পেছনে গরুর গোয়াল ও টয়লেটের পাশে।

চৌকি বাড়িটি দেখতে গৃহপালিত পাখির বাসা মনে হলেও এখানেই গাদাগাদি করে রাতে ঘুমায় পরিবারের চার সদস্য। এর মাঝে বসেই পড়ালেখাও করে পরিবারের বড় সন্তান নূরানী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। সরকার ভূমিহীনদের ঘর তৈরি করে দিলেও তালিকায় নেই কুড়িগ্রামের এই মানবেতর জীবনযাপন করা পরিবারটি।

এই চৌকি বাড়িটির অবস্থান কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভের খাষ ইউনিয়নের হাছিপাড়া গ্রামে। এই গ্রামের বাসিন্দা আজিজার রহমানের বাড়ির গোয়াল ঘর ও টয়লেটের মাঝখানে এক টুকরো ফাঁকা জায়গা। সেখানেই খোলা আকাশের নিচে একটি চৌকি পাতা। চৌকির সাথে আটকানো বাঁশের খুটিতে পলিথিন ও ছেঁড়া কাপড়ে মোড়ানো। উপরে পলিথিনের ছাউনি।

পাঁচ ফিট দৈর্ঘ ও ৪ ফিট উচ্চতার চৌকি ঘরটিতে বসবাস করে চার সদস্যসের একটি পরিবার। পরিবারে কর্তা সেকেন্দার আলী অসুস্থ। তাই সংসারের হাল ধরেছেন তার স্ত্রী আলপনা বেগম।

সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। বড় মেয়ে আট বছরের সাথী আক্তার স্থানীয় নূরানী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে রাকিব হাসানে বয়স দুই বছর। ২০ বছর আগে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারায় আলপনার বাবা। পরবর্তিতে দরিদ্র পরিবারে বিয়ে হয় আলপনার। আলপনার স্বামী দিনমজুর ও মৌসুমি রিকশাচালক। বিভিন্ন সময়ে উদ্বাস্তু হয়ে বিভিন্ন শহরে দিনাতিপাত করেছেন তারা।

করোনার আগে রংপুরে স্বামী রিকশা চালাতেন। নিজে অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবন ধারণ করলেও লকডাউনে ফিরে আসতে হয় গ্রামে। চাচার বাড়ির কোনায় এভাবেই ৭ মাস আগে স্থান হয় তাদের। একটি চৌকি পলিথিনে মুড়ে তৈরি করেছেন থাকার জায়গা। এই চৌকিতেই গাদাগাদি করে রাত পার করেন তারা।

এখানেই বসে পড়াশোনাও করে নিতে হয় বড় সন্তান সাথীর। রাতে শেষ সম্বলগুলোও তুলে রাখতে হয় এখানেই। কখনো বসে আবার কখনো আধশোয়া হয়ে রাত পার করতে হয় তাদের। আলপনার এই দুঃসহ জীবন আরো অসহনীয় হয়ে উঠেছে স্বামী নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অক্ষম হয়ে পড়ায়। এখন একমাত্র উপার্জন করেন তিনি। কখনো দিনমুজুরি আবার কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করে দুমুঠো ভাত যোগানোর চেষ্টা চলে। তবে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনির আওতায় প্রচলিত প্রকল্পে নাম নেই তার।

আলপনা জানান, স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানদের কাছে অনেক ঘুরেও কোনো সহযেগিতা পাননি তিনি। একদিকে মাথা গোজার ঠাঁই নেই; অন্যদিকে চারজনের খোরপোষ যোগানো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।

আলপনার স্বামী সেন্দোর আলী জানান, অতিকষ্টে এই চৌকিতে দুই সন্তানসহ চার জনের রাত পার করতে হয়। এই দুঃখের কথা লজ্জায় কাউকে জানাতে পারেননি তিনি।

নূরানী মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাথী আকতার বলে, রাতে এখানে ঘুমাতে তার অনেক কষ্ট হয়। তাছাড়া রাতে এখানে বসে কুপির আলোতে লেখাপড়া করতেও কষ্ট হয়।

আলপনার চাচা আজিজার রহমান জানান, আলপনাদের কোনো জমি নেই। তিনি এখানে থাকার জায়গা দিয়েছেন; কিন্তু তাদের ঘর তুলে থাকার মতো সামর্থ নেই।

এলাকাবাসী মাইদুল ইমলাম, আবিয়া বেগম, জিয়া মিয়া, সাইদুল ইসলাম জানান, পরিবারটির দুর্দশার কথা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানলেও কোনো সহায়তা করেনি। এমনকি সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প থাকলেও বঞ্চিত এই পরিবারটি।

বল্লভের খাষ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান আকমল হোসেন বলেন, পরিবারটি খুবই অসহায়। তদের বসতভিটা এমনকি থাকার ঘরও নেই। খোলা আকাশের নিচে পলিথিন মোড়ানো একটি চৌকিতে বসবাস করছে তারা।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুর আহমেদ মাছুম জানান, প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীনদের গৃহনির্মাণ চলমান রয়েছে। আলপনা বেগমকে এই প্রকল্পে জমিসহ একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়া হবে।

Author: Rijvi Ahmed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *