বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সুভাষ চন্দ্র বিশ্বসেরাদের তালিকায়

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এলসেভিয়ার প্রকাশনা সংস্থার (আইসিএসআর ল্যাব) সমন্বিত জরিপে বিশ্বসেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা। তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির মেকানিক্যাল অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক। সম্প্রতি বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকা প্রকাশ করেছে। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় নিযুক্ত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা সম্মানজনক এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় আরও আছেন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি গবেষক ড. আশরাফ দেওয়ান। ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর প্রকাশিত এ তালিকায় স্থান পেয়ে আসছেন তিনি। বর্তমানে ড. আশরাফ দেওয়ান অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বসেরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হয়ে নানান সময় অতিথি প্রভাষক হিসেবে গিয়েছেন। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকীতে তাঁর শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ এবং ঢাকা নগরের পরিবেশের ওপর দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য ভূগোল এবং মানুষ-পরিবেশ মিথস্ক্রিয়া নিয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন।

ড. সুভাষ চন্দ্র সাহা সাতক্ষীরার কলারোয়ার খোর্দ্দবাঁটরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনের শুরুতেই তিনি ধানদিয়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। পরে খুলনার সরকারি বিএল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও ফলিত গণিতে যথাক্রমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। শুরু থেকেই তিনি বাস্তব জীবন এবং প্রকৌশল শিল্পে গণিতের প্রয়োগ নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী ছিলেন। এই আগ্রহ থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের তত্ত্বাবধানে গবেষণা শুরু করেন। তাঁর তৎকালীন গবেষণাগুলোর ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক এবং প্রকৌশল জার্নালগুলোতে প্রকাশিত হয়।

গবেষণার পাশাপাশি সুভাষ চন্দ্র সাহা বাংলাদেশের নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। ২০০৯ সালে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির মেকানিক্যাল অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সিনিয়র লেকচারার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ড. সুভাষ সাহা তাঁর এই স্বল্প কর্মময় জীবনে প্রায় দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন এবং বহু আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে শ্রেষ্ঠ গবেষণাপত্রের পুরস্কার অর্জন করেছেন। গবেষণার মানের ওপর ভিত্তি করে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু সরকারি মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা অনুদানে পুরস্কৃত হয়েছেন। এগুলোর মধ্য আছে অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল লিংকেজ, ডিপার্টমেন্ট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ডিফেন্স ইনোভেশন নেটওয়ার্ক, ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রি, ইনোভেশন অ্যান্ড সায়েন্স। এ ছাড়া তিনি ন্যাশনাল নিউট্রাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন অব চায়না থেকে তিনটি সম্মানজনক গবেষণা অনুদান পেয়েছেন।

সুভাষ চন্দ্র সাহার তত্ত্বাবধানে এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী পিএইচডি এবং ২ জন এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যাঁদের মধ্যে ৪ জনকে তিনি প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সরাসরি সুপারভাইজ করেছেন। এ পর্যন্ত তিন বাংলাদেশি ছাত্রকে স্কলারশিপসহ অস্ট্রেলিয়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে দুজন পিএইচডি শেষ করে ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে শিক্ষকতা ও গবেষণায় সম্পৃক্ত রয়েছেন।

বর্তমানে ড. সাহার নেতৃত্বাধীন রিসার্চ টিম, ফ্লুইড ডাইনামিক্স এবং কম্পিউটেশনাল বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর গবেষণার উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফুসফুসের সাথে দূষিত বা ওষুধ কণিকার মিথস্ক্রিয়ার মডেল, রক্তকণিকার বিকৃতি ও প্রবাহ, বিভিন্ন প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তাপের পরিবহন, পরিচলন ও বিকিরণের মডেলসহ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন প্রয়োগ ক্ষেত্র।

লেখক: রিচার্স ফেলো, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মোনাস ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।

Author: Rijvi Ahmed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *