কাউন্সিলর চামেলীর দ’খলে শত কোটি টাকার জমি, অ’সহায় রেল কর্তৃপক্ষ

রাজধানীর প্রা’ণকেন্দ্র ফুলবাড়িয়ায় আনন্দবাজারের বাংলাদেশ রেলওয়ের শত কোটি টাকার জমি দ’খল করে রাখার অ’ভিযোগ উঠেছে ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দা রোকসানা ইসলাম চামেলীর বি’রুদ্ধে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত আসন-৫ (১৩, ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড)-এর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তিনি। অ’ভিযোগ রয়েছে, চামেলীর নেতৃত্বে প্র’তারক চ’ক্র ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ২.৮৭ একর জমি দ’খল করে রেখেছেন। রেল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মূল্যবান এই সম্পত্তি উ’দ্ধার করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, রেলভবনের একটি অ’সাধু চ’ক্র বিপুল অর্থের বিনিময়ে চামেলীর নেতৃত্বে দ’খলদারদের পক্ষ নেওয়ায় উ’দ্ধার অ’ভিযান ব্যর্থ হয়। এমনকি রেলপথ ম’ন্ত্রণালয়ের সং’সদীয় স্থায়ী কমিটিও একাধিক নির্দেশনা দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সম্প্রতি স’রকারের এই সম্পত্তির দ’খল ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ গো’য়েন্দা সংস্থাও অনুসন্ধান শুরু করেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছি। কিন্তু দ’খলদাররা আ’দালতে একটার পর একটা মা’মলা করে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত করে রেখেছে। বেশিরভাগ মা’মলাতেই রেলওয়ের পক্ষে রায় এসেছে। আমরা এখন শক্ত হাতে সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করবো।’

রেল সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৫ সালে ফুলবাড়িয়াতে ছোট্ট একটি রেল স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল। এরপর ১৯২০ সালে ফুলবাড়িয়ার আশেপাশের জমি তৎকালীন স’রকার রেলওয়ে স্টেশনের জন্য অধিগ্রহণ করে। ১৯৬৮ সালে ফুলবাড়িয়া থেকে রেলওয়ে স্টেশন কমলাপুরে স্থানান্তর করা হয়। এরপরই মূলত ফুলবাড়িয়ার রেলওয়ের সম্পত্তির দিকে কুনজর পড়ে একটি চ’ক্রের। ভুয়া দলিল বানিয়ে তারা রমনা মৌজার সিএস ১৩৬, ১৩৮ ও ১৩৯ নং দাগের ৩.৯৭ একর জমি দ’খল করে।

এ সংক্রান্ত নথি ঘেঁটে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে রেলপথ বিভাগ, যোগাযোগ ম’ন্ত্রণালয়, ভূমি সংস্কার ও ভূমি প্রশাসন ম’ন্ত্রণালয়, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য ম’ন্ত্রণালয়াধীন স’রকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর সমস্ত সম্পত্তি বেআইনি দ’খল হতে উ’দ্ধার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এসব ভূমিতে উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়ার জন্য তিনি পূর্ত ম’ন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ত ম’ন্ত্রণালয় ১৯৭৫ সালের ১১ মার্চ ৮০০ ক্ষ’তিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা করে জমা দিয়ে স’রকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

রেল সূত্র জানায়, আনন্দবাজার এলাকার মোট ৩.৯৭ একর জমির মধ্যে ১.১০ একর জমি আনন্দবাজার বণিক সমিতিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগেই ১৯৭৪ সালে বাকি ২.৮৭ একর জমি দ’খলের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের বি’রুদ্ধে মীর্জা আশ্রাফ নামে এক ব্যক্তি ১৯৭৪ সালের একটি মা’মলা দা’য়ের করেন। এরপর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মীর্জা আশ্রাফ গং, নাজমা বেগম গং, হারুণ অর রশিদ গং এবং শাহজাদী বেগম ওয়াকফ বাংলাদেশ রেলওয়ের বি’রুদ্ধে ২১টি মা’মলা দা’য়ের করে। যদিও ২১টি মা’মলার মধ্যে ১৯টি মা’মলারই রায় রেলওয়ের পক্ষে গেছে।

কিন্তু মা’মলা চলাকালীন রেলওয়ে সম্পত্তির ভুয়া দাবিদাররা বিভিন্ন ব্যক্তির কাজে জমি বিক্রি করে দেয়। মীর্জা আশ্রাফের কাছ থেকে জমি কেনার সূত্র ধরেই আনন্দবাজারে চামেলী পরিবার নিজের আধিপত্য বিস্তার করে।

একাধিকবার হাতবদল
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আনন্দবাজারে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি দ’খলকারীরা একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছেন। সেই জমির ক্রেতারা আবার অন্যের কাছে বিক্রি করেছেন স’রকারি এসব সম্পত্তি। এভাবেই একাধিকবার হাতবদল হয় রেলওয়ের এসব জমি। আনন্দবাজার বণিক সমিতির বরাদ্দকৃত জমি বাদে বাকি ২.৮৭ একর জমির মালিকানা দাবিদারকারী হয়েছেন ৯৬ জন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন সংরক্ষিত আসনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দা রোকসানা ইসলাম চামেলী।

এ সংক্রান্ত নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, মীর্জা আশ্রাফের দ’খলে থাকা অবস্থায় এই জমির দেখাশোনা করতেন চামেলীর বাবা সিরাজুল ইসলাম। ১৯৭৮ সালে মীর্জা আশ্রাফ সিরাজুল ইসলামকে ৫ শতক জমি দান করেন। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম সে সময় ৫ এর আগে ৪ বসিয়ে মোট ৪৫ শতাংশ জমি লিখে নেন। মীর্জা আশ্রাফ এই জালিয়াতির অ’ভিযোগে একটি মা’মলাও করেছিলেন। যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ের (পূর্ব) বিভাগীয় এস্টেট অফিসের আইন কর্মকর্তা সালাউদ্দীন আহমেদ বলেন, রেলওয়েকে আ’টকানোর জন্য একটি চ’ক্র একের পর ভুয়া মা’মলা দা’য়ের করেছিল। এর মধ্যে অনেক মা’মলাই খারিজ হয়ে গেছে। আমরা রেলের জমি রেলের দ’খলে নেয়ার চেষ্টা করছি।

দ’খলদারদের সঙ্গে রেল কর্মকর্তাদের যোগসাজশ
রেলওয়ে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মীর্জা আশ্রাফের কাছ থেকে কেনা জমির সূত্র ধরেই চামেলীর পরিবার আনন্দবাজারে আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। চামেলী নিজে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যরা বিএনপির রাজনীতিতে জ’ড়িত। এ কারণে সব স’রকারের আমলেই তারা আধিপত্য ধরে রেখেছেন। সূত্র জানায়, রেলওয়ের কিছু দু’র্নীতিবাজ কর্মকর্তা নেপথ্যে থেকে দ’খলদারদের সহযোগিতা করে আসছেন। বিনিময়ে পাচ্ছেন মোটা অংকের মাসোহারা, যাতে জমি পুনরুদ্ধারে রেলওয়ে জো’রালো কোনও ভূমিকা না রাখে। দ’খলদারদের পক্ষ হয়ে পুরো বি’ষয়টি সমন্বয় করেন কাউন্সিলর চামেলী নিজেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, মাঝেমাঝেই উ’চ্ছেদ ঠেকানোর জন্য প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪-৫ হাজার টাকা করে চাঁ’দা নেওয়া হয়। এছাড়া প্রতিমাসে মা’মলার খরচের জন্য তাদের কাছে ৫শ’ টাকা ‘ফি’ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ওই সূত্র জানায়, এই দীর্ঘ সময়ে রেল কর্তৃপক্ষ মাত্র দুবার নিজেদের সম্পত্তি উ’চ্ছেদের চেষ্টা করেছিল। ২০০৭ সালে এবং ২০১১ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পুলিশ এবং র‌্যা’বের সহায়তায় উ’চ্ছেদ অ’ভিযান চালাতে গিয়ে দ’খলদারদের কাছে বা’ধা পেয়ে ফিরে আসে।

অবশ্য ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল উ’চ্ছেদ অ’ভিযানে বা’ধা দেওয়ার অ’ভিযোগে শাহবাগ থানায় একটি মা’মলা দা’য়ের করা হয়। ওই মা’মলায় কাউন্সিলর চামেলীর স্বামী আবুল হোসেন টাবু, দুই ভাই সফিকুল ইসলাম স্বপন ও সামসুল ইসলাম লাবলু, মা মমতাজ ইসলাম, দ’খলদার হারুন অর রশিদ, হাফিজ, ওয়াহিদুজ্জামানের নাম উল্লেখসহ অ’জ্ঞাতনামাদের আ’সামি করা হয়। পরে ২০১২ সালের ২ ডিসেম্বর রেলওয়ের পক্ষ থেকে আবারও উ’চ্ছেদ অ’ভিযানের জন্য পুলিশি সহায়তা চেয়ে একাধিক চিঠি চালাচালি হলেও র’হস্যজনক কারণে অ’ভিযান পরিচালিত হয়নি।

সিটি করপোরেশনের গাফিলতি
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, আনন্দবাজারের ৩.৯৭ একর জমি ১৯৮৪ সালে আন্তম’ন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনটি শর্তে ব্যবস্থাপনার জন্য তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। শর্ত তিনটি হলো−ভূমির মালিকানা স্বত্ব রেলওয়ের থাকবে, মোট আয়ের ৫ শতাংশ রেলওয়েকে দিতে হবে এবং ধরন/আকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশন এই ভূমি যথাযথভাবে সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও মা’মলা পরিচালনা না করায় এই সম্পত্তির মালিকানা হু’মকির মুখে পড়েছিল। পরে ২০০৬ সালের ১৯ অক্টোবর তৎকালীন যোগাযোগ ম’ন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে সিটি করপোরেশনকে দেওয়া বরাদ্দ বাতিল করা হয়।

রেল সূত্র জানায়, আনন্দবাজারসহ রেলওয়ের মোট ১২টি মার্কেট ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী আয়ের ৫ শতাংশ রেল কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা থাকলেও ১৯৯৩ সালে একবার মাত্র ২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা জমা দিয়েছিল। রেল সূত্র জানায়, ২০১০ সালে রেলওয়ের মালিকানাধীন ৩.৯৭ একর জমির মধ্যে ১.১০ একর জমিতে আনন্দবাজার বণিক সমিতিকে বরাদ্দ দেয়। পরে আনন্দবাজার রেলওয়ে সুপার মার্কেট লি. নামে এটি পরিচালিত হলেও বরাদ্দকৃতরা অনেকেই চামেলী পরিবারের দাপটের কারণে দোকানের দ’খল নিতে পারেনি। এ কারণে যাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে বকেয়া লাইসেন্স ফিও আদায় করতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দা রোকসানা ইসলাম চামেলী সকল অ’ভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘মীর্জা আশ্রাফ গংয়ের কাছ থেকে ক্রয়সূত্রে এই সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন আমার বাবা। এটা নিয়ে রেলওয়ের সঙ্গে আমাদের মা’মলা চলছে। এই জমিতে আ’দালতের স্টে অর্ডার আছে। স্টে অর্ডার থাকাকালীন রেল এখানে উ’চ্ছেদ অ’ভিযান চালাতে পারে না।’ আনন্দবাজারের অ’বৈধ দ’খলদারদের হয়ে সমন্বয় ও চাঁ’দাবাজি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি সত্য নয়। এখানে ৯৬ জন মালিক রয়েছে। সবাই যৌথ ও এককভাবে মা’মলা করেছে। সবাই মিলে মা’মলার খরচ চা’লানো হয়।’ সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

Author: Rijvi Ahmed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *