সংসার চালাতে না পেরে মুদিদোকানির পেশা বেছে নিলেন স্কুল শিক্ষক

করোনা পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশনায় গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা। এ অবস্থায় সংসারের আর্থিক দৈন্যতা কাটাতে অনেকেই শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে বাধ্য হয়েছেন অন্য পেশায়। তাই এই সমস্যা সমাধানে সরকারি প্রণোদনাসহ যত দ্রুত সম্ভব সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। আর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রণোদনার বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানালেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

ঠাকুরগাঁও জে আর পি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক বখতিয়ার আলম। দীর্ঘ দশবছর ধরে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের গৃহশিক্ষক হিসেবে যা উপার্জন করতেন তা দিয়ে বেশ ভালোভাবেই কেটে যেত তার সংসার। কিন্তু হঠাৎ বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। প্রথম কিছুদিন ঋণ করে সংসার চালাতে হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় চরম হতাশায় পড়েছেন তিনি। বাধ্য হয়ে বাড়ির পাশে খুলে বসেছেন ছোট মুদিখানার দোকান। বখতিয়ার জানান, লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করা সম্ভব হয়নি। পরে নিজ এলাকার জে আর পি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতার চাকরি নেন এবং বাড়তি সময়ে টিউশনি করতেন। করোনার কারণে উপার্জন বন্ধ হয়ে গেলে পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। এই অবস্থায় কুল-কিনারা না পেয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ির পাশে মুদিখানার দোকান দিয়েছেন। এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার।

এ অবস্থা শুধু বখতিয়ারের নয়, অনেকেই এখন শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা।
রিয়েল পাবলিক স্কুলের শিক্ষিকা সেলিনা আক্তার জানান, স্কুল বন্ধ থাকলেও সংসারের খরচ বন্ধ নেই। গত কয়েকমাসে খুব কষ্টে কেটেছে। আর্থিক সংকটের কারণে নিজেই বাড়িতে শেলাই ও বিভিন্ন কারুপণ্যের কাজ করছেন। বিছনার চাদর, টেবিল ক্লথ, সোফার কাভারসহ বিভিন্ন কাপড়ে নকশা করে তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে যা আয় হচ্ছে তা দিয়ে কোনমতো সংসার পরিচালনা করছেন তিনি।

লিবার্টি রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা হাসিনা মমতাজ জানান, স্কুল বন্ধ, তাই বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। কবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা জানা নেই। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে অনেক বিপদে পড়তে হবে তাকে।

রিয়েল পাবলিক স্কুলের শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, করোনার কারণে হাতে জমানো যে সামান্য টাকা ছিল তা দিয়েই কিছুদিন সংসার চালান। পরে আর্থিক সংকটে পড়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় অনিশ্চিয়তার মধ্যে দিন কাটছে।

সোনালী শৈশব বিদ্যা নিকেতনের শিক্ষক জালাল উদ্দীন জানান, করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের প্রণোদনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করছেন। অথচ মানুষ গড়ার কারিগর কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের জন্য কোনো ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা নেই। তাই এই দুঃসময়ে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করনে তিনি।

ঠাকুরগাঁও জেলা কিন্টারগার্ডেন এন্ড প্রিক্যাডেট স্কুল সমিতির সাধারণ সম্পাদক এসএম বেলাল জানান, একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাজীবন শুরু হয় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের হাত ধরে। অথচ এই শিক্ষকরাই সরকারি সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই আবারো স্বাভাবিক জীবনে ঘুড়ে দাঁড়াতে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খোলার অনুমতি দেয়া প্রয়োজন।

জেলা শিক্ষা অফিসার খন্দকার মো. আলাউদ্দীন আল আজাদ জানান, বেসরকারি মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের নন-এমপিও শিক্ষকরা সরকারি প্রণোদনা পেয়েছেন। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হয়। এই শিক্ষকরাও যেহেতু দেশের নাগরিক, সেই বিবেচনায় সরকার অবশ্যই তাদের পাশে থাকবে।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ্ আল মামুন কালের কণ্ঠকে জনান, করোনাকালীন বেসরকারি শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষকে সরকারি খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা পেলে অবশ্যই তাদের জন্যে বিশেষ সহায়তার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় প্রায় ১০০টি ও সমগ্র জেলায় ৩০০টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারি সম্পৃক্ত রয়েছেন। সর্বশেষ ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলে চরম হতাশায় পড়েছেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারিরা। তাই আগামী জানুয়ারি থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খোলার অনুমতি দিলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মচারিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন বলে মনে করেন অনেকেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *