সাকিবকে কালীপূজায় নিয়ে যাওয়া কে এই পরেশ পাল?

বিশ্বসেরা অল-রাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে তাড়া করে ফিরছে একের পর এক বিতর্ক। সর্বশেষ বিতর্ক ক’দিন আগে তার কলকাতায় যাওয়ার ঘটনা নিয়ে। ক্রিকেটে তার নিষেধাজ্ঞার অবসানের পর স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ঢাকায় সুপার-শপ উদ্বোধন, বেনাপোল সীমান্তে ভক্তের হাত থেকে মোবাইল ফোন ফেলে দেয়া, কিংবা মুসলমান হয়ে কী করে পুজার উদ্বোধনে গেলেন, পরে আবার সেই ঘটনার জন্য আবার কী করে ক্ষমা চাইলেন – ক্রিকেট পিচে রানের মতো একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছেন তিনি।

বিতর্কটা শুধু আবার বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়েছে ভারতেও। হিন্দুত্ববাদীরা প্রশ্ন তুলছে, পূজা মণ্ডপে যাওয়ার পরে সাকিব ক্ষমা চাইলেন কেন? তবে এসব বিতর্ক হতই না যদি পরেশ পাল নামের এক রাজনৈতিক নেতা সাকিবকে কলকাতায় আমন্ত্রণ না জানাতেন। এবার জানা যাক এই পরেশ পাল সম্পর্কে। তৃণমূল কংগ্রেসের এই নেতার আদি বাড়ি বরিশাল, মামার বাড়ি বাগেরহাট। ভারত ভাগ হওয়ার এক বছর আগে জন্ম নেওয়া পরেশ পালের পরিবার উদ্বাস্তু হিসাবে জন্মভিটা ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন।

সাকিবকে নিয়ে বিতর্কের মাঝে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তো কোরবানির ঈদের আগে বাংলাদেশে গেলে জবাই করার গরু কিনতে মুসলমান বন্ধুদের নিয়ে গরুর হাটে গিয়েই থাকি। এ আর নতুন কথা কি! আর বাংলাদেশে যেতে আমার দাওয়াত লাগবে নাকি, ওটা তো আমার জন্মভিটা। আমাদের আদি বাড়ি ছিল বরিশাল, আর জন্মেছি মামার বাড়ি বাগেরহাটে।’

এখন পূর্ব কলকাতার কাঁকুড়গাছি এলাকায় তাদের বসবাস। বেড়ে ওঠা, রাজনীতি – সবকিছুই ওই এলাকা ঘিরেই। পরে কংগ্রেসি ঘরানার রাজনীতি করলেও একেবারে ছোটবেলা থেকে তিনি বড় হয়েছেন বামপন্থী দল আরএসপি নেতা মাখন পালের কাছে। আরএসপির মাখন পালকে নাকি তিনি নিজের বাবার মতো মনে করেন। দেশ ভাগের পরে ভারতে চলে আসার পথেই পরেশ পালের এক বোন হারিয়ে যান। সেই দুঃখ তিনি কোনদিন ভুলতে পারেন নি। সেজন্যই অসহায়, দুস্থ মেয়েদের সাহায্য করার জন্য বহু বছর ধরে তার এলাকায় গণ-বিবাহ আয়োজন করেন তিনি।

তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সুখেন্দু শেখর রায় বলেছেন, ‘পরেশই সম্ভবত ভারতে প্রথম গণ-বিবাহের ধারণাটা চালু করে প্রায় ৪০ বছর আগে। এছাড়াও ওর আরেকটা বড় উদ্যোগ সুভাষচন্দ্রের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে একমাস ধরে সুভাষ মেলা করা। আর বছর ১০-১২ ধরে সে ইলিশ উৎসব করছে। এছাড়াও বড় করে কালীপূজো তো করেই।’

কাঁকুড়গাছি-বেলেঘাটা এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ অবশ্য বলছেন, পরেশ পালের উদ্যোগে হওয়া ওই বাৎসরিক গণ-বিবাহের ইতিবাচক একটা দিক থাকলেও বেশ কিছু বর-কনেকে দেখা যায় প্রতিবছরই ওই বিবাহ অনুষ্ঠানে বিয়ে করতে। গণ-বিবাহের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর জন্য এটা করা হয় বলে এলাকার ওই বাসিন্দাদের ধারণা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাসিন্দা বলেছেন, ‘এলাকার রিকশাচালক, বিধবা নারীদের নিয়ে গিয়ে ওই অনুষ্ঠানে বিয়ে দেয়া হয়। তাদের সারাদিনের খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক বিয়েই তিন থেকে চার দিনের বেশী টেকে না বলেই আমরা জানি। উনি সবসময়েই চমক দিতে পছন্দ করেন।’

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা সুখেন্দু শেখর রায়ও বলেন, ‘রাজনীতি হোক বা সামাজিক কাজকর্ম, চমক দেওয়াটাই পরেশের স্বভাব। এই যে সাকিব আল হাসানকে নিয়ে বিতর্ক, সেখানেও সে মনে হয় চমকই দিতে চেয়েছিল। অন্য অনেক পূজা কমিটি ভারতের ক্রিকেটারদের দিয়ে উদ্বোধন করায়। কিন্তু ওর মাথায় কাজ করেছে আমি ভারতের ক্রিকেটার কেন আনব, বাংলাদেশের স্টার ক্রিকেটার নিয়ে আসব। ও এরকমই।’

তবে এলাকায় কান পাতলে শোনা যায় ওইসব ‘ইতিবাচক’ সামাজিক কাজের জন্য বেলেঘাটা-কাঁকুড়গাছি অঞ্চলের ধনী বাসিন্দাদের কাছ থেকে বড় রকমের চাঁদা আদায় করেন পরেশ পাল। ২০১৬ সালে সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিয়মমাফিক যে আয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে যে তিনটি বাসভবনসহ পরেশ পালের স্থাবর সম্পত্তি আছে ৬৮ লক্ষ রুপির এবং ব্যাঙ্ক আমানত, গাড়ির মতো অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৪০ লক্ষ রুপি।

আয়ের উৎস যাই হোক না কেন, পরেশ পাল যে দল-ধর্ম নির্বিশেষে এলাকাবাসীর জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, সেটা এলাকার অনেক বাসিন্দাই মনে করেন। পরেশ পাল বলেন, ‘আমি ওই সব হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ বুঝি না, মানি না। হাতের আঙ্গুল কাটলে তো সবারই তো লাল রক্ত বের হবে।’

আবার পরেশ পাল সম্পর্কে অন্য কথাও শোনা যায়। বেলেঘাটার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরেশ পাল দল মত নির্বিশেষে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন বলে যে কথাটা চালু আছে, তা অনেকটাই অসত্য। বহু বামপন্থী কর্মী পরেশ পালের সহচরদের অত্যাচারে হয় এলাকা ছাড়া হয়ে আছে অথবা রাজনীতি থেকে সরে গেছে। তার কোনো কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলে মার খেয়েছে, এমন উদাহরণও আছে অনেক।’

পরেশ পালকে কাছ থেকে দেখা কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী বলেছেন, ‘পরেশদার একটা টিম আছে যারা ২৪ ঘণ্টাই এলাকায় তৎপর থাকে। যে কোনো মানুষ বিপদে পড়লে, তারা এগিয়ে যায়। এ ব্যাপারে খুব সংগঠিত পরেশদা। এটা কিছুটা সম্ভবত শিখেছে প্রয়াত তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অজিত পাঁজার কাছ থেকে। তিনিও যেমন নিজের নির্বাচনী এলাকার খুঁটিনাটি তথ্য রাখতেন, পরেশদার টিমটাও সেরকম। বেলেঘাটা অঞ্চলে তার এমনই প্রভাব, যে একবার তো স্বয়ং মমতা ব্যানার্জীকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।’

তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে গিয়ে পৌরসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জীর অফিসিয়াল প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিজের প্রার্থী দাঁড় করিয়ে জিতিয়ে এনেছিলেন পরেশ পাল। তারপরে যদিও আবারও তিনি তৃণমূল কংগ্রেসেই ফিরে গেছেন। প্রথমে কংগ্রেস দলের হয়ে বিধানসভার সদস্য হন ১৯৯৬ সালে। পরের বারও তিনি জয়ী হন। মাঝের পাঁচ বছর বাদ দিয়ে ২০১১ সাল থেকে পরপর দুই বার তিনি বেলেঘাটার এমএলএ নির্বাচিত হয়েছেন।

জয়ন্ত চৌধুরী আরও বলেন, ‘বিধানসভায় কোনোদিন পরেশ পালকে কোনো বক্তৃতা দিতে বা কোনো বিষয় উত্থাপন করতে দেখি নি। সে নিজের এলাকা নিয়ে পড়ে থাকে আর নানারকম অদ্ভুত আইডিয়া বের করে। একবার ব্রিগেড ময়দানে বামফ্রন্টের প্রতীকী মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী। সেই যে বিরাট ঘণ্টা বানানো হয়েছিল, সেটাও ছিল পরেশদার আইডিয়া। একবার কলকাতায় মশাবাহিত রোগ বাড়ছে বলে ধর্মতলায় প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে রাস্তায় বিশাল একটা মশারী টাঙ্গিয়ে দিল। আরেকবার গরু-ছাগল নিয়ে গিয়ে পথ অবরোধ করেছিল।’

দীর্ঘদিন রাজনীতি করলেও পরেশ পাল মন্ত্রীও যেমন হন নি, তেমনই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদও পান নি। তৃণমূল নেতা সুখেন্দু শেখর রায়ের কথায়, ‘পরেশ বোধহয় এসব চায়ও না। এলাকার বাইরে বেরিয়ে রাজনীতি বা সামাজিক কাজ করতে তার খুব একটা আগ্রহ নেই।’ কিন্তু সেই পরেশ পালই এখন সাকিব আল হাসানকে কালীপূজার উদ্বোধনে নিয়ে এসে দুই দেশেই তুমুল আলোচিত হয়ে উঠেছেন। মাঝখান থেকে ফায়দা লুটেছে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *