হাত পেতে বেঁচে থাকা কষ্টের, একটা চায়ের দোকান দিতে পারলে ভিক্ষা ছেড়ে দেব

সেদিন দুপুরে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে কাজ সেরে জাকির হোসেন রোডের দিকে ফিরছিলাম। কাজী নজরুল ইসলাম রোড দিয়ে হেঁটে আসার সময় দেখলাম হুইল চেয়ারে বসা এক ভদ্রলোক ইশারা করছেন তার কাছে যাওয়ার জন্য। রাস্তার মাঝখানে হুইলচেয়ার নিয়ে আটকে আছেন তিনি। ভাবলাম হয়তো ঠেলে দিতে হবে। কিন্তু কাছে গিয়ে তাকে কি সহায়তা চান জিজ্ঞাসা করার পর বললেন, তার আর্থিক সহায়তা দরকার। ঝকঝকে হুইল চেয়ারে বসে একটা বয়স্ক লোক ভিক্ষা চাইছেন ভাবতে গিয়ে একটু অবাক হলাম। বললাম-

‘বাসা কোথায়?’
‘ক্যাম্পে থাকি?’
‘কোন ক্যাম্প, টাউন হলের সামনে একটা ক্যাম্প আছে ওটায়?’
‘না, জেনেভা ক্যাম্প।’

উত্তর দিতে দিতেই পায়ের দিকে দেখালেন। দেখলাম। পায়ের গোঁড়ালির সংযোগস্থলের কাছে পা’টা ফেটে গেছে। পায়ে গভীর ক্ষত। ভালো ট্রিটমেন্ট দরকার। ওটা থেকে চোখ সরাতেই ডান পায়ের তলা দেখালেন। পায়ের তলার মাঝ বরাবর একটা গর্ত। দুই পা অকেজে। জানালেন আগে বসে বসে ভিক্ষা করতেন, এখন হুইল চেয়ার পেয়েছেন। সেটায় চলাফেরা করে। মানে ভিক্ষা করেন। হুইল চেয়ারের পেছনে লেখা একজন ব্যক্তির সৌজন্য মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামক একটি সংগঠন হুইল চেয়ারটি দিয়েছে উপহার।

‘আপনার নাম জানা হলো না।’
‘আমার নাম ফারুক।’
‘বয়স কত হতে পারে?’
‘সত্তর।’
‘আপনার আসল বাসা কোথায়?’
‘পার্টিশনের আগে আমরা গেন্ডারিয়া থাকতাম।’
‘তার আগে?’
‘গেন্ডারিয়াতেই আমাদের বাড়ি ছিল।’
‘তার আগে? মানে গেন্ডারিয়ার আগে আপনার বাবা কোথায় ছিলেন?’
আমার বাবা পাটনার লোক। পাটনায় ছিলেন। চামড়ার ব্যবসা করতে ঢাকায় আসে। তখন আমি আমার মায়ের পেটে। ঢাকায় আমার জন্ম হয়। বাবা ছোটবেলা মারা গেল। পার্টিশনের (একাত্তর পরবর্তী) সময় জেনেভা ক্যাম্পে থাকলাম। মা মারা গেছে। বিয়ে করেছি মিরপুরে। স্ত্রীও এখন অসুস্থ। আমার চার মেয়ে। কোনো ছেলে নাই। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। কারো কারো ঝামেলা হয়েছে। ক্যাম্পে আমরা দুইজন থাকি, আমাকে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতে হয়। না হলে খেতে পারবো না। শুক্রবারে এই সামনের মসজিদের কাছে বসি ওইদিন বেশি টাকা পাই।

একটানা কথা বলতে গিয়ে হাপিয়ে গেছেন লোকটি। জানতে চাইলাম, ভিক্ষা করেই বাকি জীবনটা পার করে দেবেন?
‘ভিক্ষা তো সখ করে করে না। আমিও তো ভিক্ষা করতে চাই না। মানুষের কাছে হাত পেতে বেঁচে থাকা কষ্টের। কিন্তু আমার তো কোনো আয় নেই। ছেলে নেই যে আমাকে খাওয়াবে। তাই ভিক্ষা করি। যদি টাকা জমে তাহলে একটা চায়ের দোকান দিব। আমি ভালো চা বানাতে পারি… টাকা জমাচ্ছি ‘

শেষ বাক্যের ডেলিভারির সময় প্রবীণ চোখ গুলো যেন জ্বলে উঠল। ক্ষণস্থায়ী জ্বলজ্বলে চোখে যেন স্বপ্ন খেলে দিল মুহূর্ত। সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কি না কে জানে! কিছু স্বপ্ন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পূরণ হয়ে যায়, কিছু স্বপ্ন থেকে যায় অধরা।

ওখান থেকে চলে আসার সময় জেমসের গাওয়া একতা গানের কথা খুব মনে পড়ছিল- বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে আমার প্রবীণ দুঃখগুলো…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *