দেশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর সাকার ফিশ

মাছটি সম্পর্কে জিওগ্রাফি অ্যান্ড ইউ ডটকম বলছে, ‘অ্যাকুয়ারিয়ামের পরীই উন্মুক্ত জলাশয়ের দানব’। আবার গালফ নিউজের এক শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘সাকার ফিশের আগ্রাসনে কর্তার কপালে চিন্তার ভাঁজ’।

বলছি সাকারমাউথ ক্যাটফিশের কথা। অ্যাকুয়ারিয়ামের শোভাবর্ধক এই মাছটি উন্মুক্ত পরিবেশ পেলে আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। দ্রুত বংশবিস্তার ও প্রচুর খাদ্য গ্রহণের কারণে জলাশয়ের অন্যান্য প্রাণী হুমকির মুখে পড়ে। ইতোমধ্যে এই মাছের কারণে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে মিয়ানমার ও আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ। বর্তমানে আগ্রাসী এই মাছ ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের উন্মুক্ত জলাশয়েও।

কিছুদিন আগে পুকুর ও লেকে মাঝেমধ্যে মাছটির দেখা মিললেও এখন দেশের বিভিন্ন নদনদী ও খালবিলে পাওয়া যাচ্ছে হরহামেশাই। প্রতি বছর বর্ষা এলেই বুড়িগঙ্গা নদীতে জাল ফেলেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঝাউচরের বাসিন্দা সুরুজ মিঞা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আগে সবসময় নদী থেকে দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ পাওয়া গেলেও এবার ‘অপরিচিত’ এক মাছ উঠছে তার জালে।

তিনি বলেন, অতীতে কখনও বুড়িগঙ্গায় এই মাছ দেখেননি। আর এবার জাল ফেললেই উঠে আসছে। নাম না জানা এই মাছটিকে তারা ডাকছেন হেলিকপ্টার মাছ বলে। অন্যদিকে ঝিনাইদহের শৈলকূপা পৌর এলাকার আউশিয়া গ্রামের পুকুর মালিক রশিদার রহমান জানান, তিন-চার বছর আগে অন্য মাছের পোনার সঙ্গে অদ্ভুত এই মাছটি পুকুরে আসে। এখন এই মাছের অত্যাচারে অতিষ্ঠ তিনি।

পুকুর থেকে কোনোভাবেই নিধন করা যাচ্ছে না। স্থানীয় বিভিন্ন খাল-বিল, নদীতেও এটি প্রচুর পরিমাণে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া নওগাঁ, পিরোজপুর, টাঙ্গাইল, নাটোর, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় পুকুর ও উন্মুক্ত জলাশয়ে এই মাছ ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে এই মাছের বিস্তার বিষয়ে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) ড. মো. খলিলুর রহমান বলেন, রাজধানীর গুলশান লেকে প্রথম এই মাছ পাওয়ার খবর পেয়েছিলাম।

বাংলাদেশে এই মাছের বিস্তার নিয়ে এখনও কোনো গবেষণা হয়নি। তবে আমি জেনেছি, ১০-১২ বছর আগে মাছটি প্রথম এই দেশে আনেন একজন কূটনীতিক। তিনি নিজের অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য মাছটি এনেছিলেন। বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার সময় সেই মাছ গুলশান লেকে ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে এই মাছ পাওয়ার খবর দিচ্ছেন জেলেরা। গুলশান লেক থেকে কীভাবে সারাদেশে মাছটি ছড়িয়ে পড়ল তা জানাতে পারেননি তিনি।

জিওগ্রাফি অ্যান্ড ইউ ডটকম জানিয়েছে, মিঠাপানির এই মাছটির আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ। বিশেষত ব্রাজিলে অ্যামাজন অববাহিকায় এই মাছ প্রচুর পাওয়া যায়। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম টেরিগোপ্তিকথিস। মাছটির শরীর অনেক খসখসে ও ধারালো। এর পাখনাগুলোও অনেক ধারালো। ১৬-১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হওয়া এই মাছ প্রচুর পরিমাণে খাবার খায়।

বিশেষত জলাশয়ের সব শ্যাওলা খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এ ছাড়া চিংড়ি ও ছোট শামুক জাতীয় শক্ত খোলের প্রাণী খেয়ে সাবাড় করে ফেলে। এরা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে অন্যান্য মাছের আবাসস্থল দখল করে ফেলে। মাছটি পানি ছাড়াই ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকতে পারে। এদের মধ্যে লাফানোর প্রবণতা থাকায় তারা এক জলাশয় থেকে আরেক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই মাছের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে মিয়ানমার টাইমস জানিয়েছে, এই মাছ প্রচুর খাদ্য গ্রহণের কারণে জলাশয়ের অন্যান্য মাছ খাদ্য সংকটে পড়ে। এ ছাড়া এই মাছের আঘাতে অন্য মাছের শরীরে ঘা ও ইনফেকশন হয়ে যায়।

আক্রান্ত মাছগুলো খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। এতে মাছগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়, একপর্যায়ে সেগুলো মারা যায়। ফলে সাকার ফিশের উপদ্রবে অনেক মৎস্য খামারি পথে বসেছেন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে চীন থেকে বিশেষজ্ঞ দলও এনেছিল মিয়ানমার, কিন্তু কোনো সমাধান মেলেনি।

বাংলাদেশে সাকার ফিশের প্রভাব নিয়ে ড. মো. খলিলুর রহমান বলেন, আমাদের দেশের আবহাওয়া এই মাছের জীবনধারণের জন্য খুবই অনুকূল। দ্রুত মাছটির বিস্তার বন্ধ করা না গেলে বাংলাদেশের মাছ চাষিরাও মিয়ানমারের মৎস্য খামারিদের মতো ঝুঁকিতে পড়বেন।

সাকার ফিশ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, মাছটির জীবনীশক্তি অনেক বেশি। বিষ প্রয়োগে এই মাছ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, জলাশয় একেবারে শুকিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু উন্মুক্ত জলাশয় থেকে নির্মূলের উপায় এখনও জানিনা আমরা। সে ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন করতে হবে, যেন কোথাও মাছটি পাওয়া গেলেই সঙ্গে সঙ্গেই সেটি ধ্বংস করা হয়। এ ছাড়া সাকার ফিশ ধরার পর শুকিয়ে অন্যান্য মাছ ও পশুপাখির খাবারও তৈরি করা যায়।

সাকার ফিশের বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজ বলেন, মাছটি অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য ভালো। এটি অন্যান্য মাছের আবর্জনা ও শ্যাওলা খেয়ে অ্যাকুয়ারিয়ামের পরিবেশ ভালো রাখে। কিন্তু উন্মুক্ত পরিবেশের জন্য এই মাছটি খুবই ক্ষতিকর।

সেজন্য কোথাও উন্মুক্ত জলাশয়ে এই মাছ পাওয়া গেলে আমরা ধ্বংস করার পরামর্শ দেই। খুব শিগগির আমার মৎস্যচাষিসহ সাধারণ মানুষকে সাকার ফিশের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে কাজ শুরু করব। মৎস্য আইন ২০১১ অনুযায়ী দেশে এ ধরনের বিদেশি মাছ চাষ দণ্ডনীয় অপরাধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *