বাংলাদেশের ইউটিউব গ্রাম, যে গ্রামে প্রতি সপ্তাহে লাখ টাকার খাবার পায় বিনামূল্যে

ভরদুপুরের নিস্তব্ধতায় ছেদ পড়ল ঘুঘুর ডাকে। নিয়মিত বিরতিতে তার হাঁকডাক শোনা গেল আরও কয়েকবার। ধানখেতের পাশে গাছের ছায়ায় একখণ্ড উঠান যেন। একদিকে খামারবাড়ি। অন্যপাশে বাঁশঝাড়, লতাগুল্ম, আম, জামসহ নানা গাছ। রান্নার এন্তেজাম হয়েছিল সেখানেই। বিরিয়ানি ভরা তিনটি সসপ্যান চুলা থেকে নামানো হয়েছে ততক্ষণে। সবুজ ঘাসের ওপর মাদুর বিছিয়ে খেতে বসেছেন তিনজন। ফেসবুক, ইউটিউবে যাঁদের নিত্য যাতায়াত। তাঁদের কাছে শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত লিয়াকত আলী, লোকমান আলী, আতিয়ার আলীর পরিচিতি ‘দাদু’। সত্তরোর্ধ্ব এই তিনজনের মাথায় থাকে গামছা বাঁধা, কখনো স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বা কখনো খালি গায়ে রান্না করেন। নিজেরা মজা করে খান, খাওয়া শেষে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেন গ্রামের প্রতিবন্ধী মানুষ, অসহায় আর বৃদ্ধদের হাতে। ইউটিউবে ভিলেজ গ্র্যান্ডপা’স কুকিং নামের চ্যানেলে তাঁদের এই কর্মকাণ্ডের ভিডিও দেওয়া হয়। সাদাসিধে এই দাদুদের ভিডিওগুলো দেখেন লাখ লাখ মানুষ।

লাখো মানুষ যাঁদের পর্দায় দেখেন, ক্যামেরার পেছনে তাঁদের জীবনকথা জানতেই গত ৩১ অক্টোবর গিয়েছিলাম কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। যে গ্রাম এখন পরিচিত ইউটিউব গ্রাম নামে। গ্রামের মোল্লাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের বাড়িতে চলে দাদুদের রান্না। সেদিনও রান্না শেষে মাঝারি আকারের সসপ্যানের তিনটি ঢাকনায় তুলে আনা হলো বিরিয়ানি। দাদুদের সামনে রাখা হলো। আরেকটি ঢাকনায় খাবার নিয়ে গোল হয়ে বসলেন তিনজন। তাঁদের ঘিরে ডিএসএলআর ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত সজীব হোসাইন। ভিডিও করছেন এই তরুণ। তিনিই নির্দেশনা দিচ্ছেন কথা বলার, পাত্র থেকে খাবার তোলার।

‘হেবি সুন্দর টেস হইয়াছে রে…।’

পরিচালকের নির্দেশে এক লোকমা বিরিয়ানি মুখে পুরে কথাটা বললেন লিয়াকত আলী। বিরিয়ানির স্বাদ যে মুখে লেগে থাকার মতোই হয়েছে, বিনা বাক্যে তাতে সায় দিলেন পাশে বসা দুজন। সকাল থেকে তিনটি ভেড়া জবাই, মাংস কাটাকুটি, ১৭ কেজি চালের বিরিয়ানি রান্না—সবই করেছেন এই তিনজন। সহায়তার জন্য অবশ্য ছিলেন আরও কয়েকজন।
খেতে খেতে চলে গল্প। লোকমান আলী বলেন, ‘আমরা আটজনের দল। আরেকজন দাদাও আছে।’ এই দাদুর নাম নেয়াব আলী। নিয়মিত দাদুদের অনুপস্থিতিতে তিনি হাজির হন ক্যামেরার সামনে। আতিয়ার আলী বলেন, ‘বয়স হইয়াছে। কৃষিকাজও করতি পারিনে। হাতখরচের জন্য ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এখানে কাজ পাইয়া ভালো হইয়াছে। রোজ ৪০০ টাকা পাই।’

খাওয়া শেষে তাঁরা বিরিয়ানি প্যাকেট করবেন। আমরা ছুটলাম অন্য আয়োজনে।
গ্রামবাসীর জন্য গরুর তেহারি
খামারবাড়ি থেকে মিনিটখানেকের দূরত্বে দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি। এর পাশেই চলছে তেহারি রান্নার তোড়জোড়। দেলোয়ার হোসেন বললেন, ‘এটা অ্যারাউন্ড মি বিডির রান্না। আজ ৪৩ কেজি গরুর মাংস আর ৬০ কেজি চালের তেহারি হবে।’

অ্যারাউন্ড মি বিডি অনেকের কাছেই পরিচিত। ইউটিউব চ্যানেলটিতে কখনো পাড়াসুদ্ধ মানুষের রান্নার আয়োজন, অভিনব উপায়ে খালে-বিলে মাছ ধরা, অতিকায় হাতি-ঘোড়া বানিয়ে শিশুদের দুরন্তপনার ভিডিও রাখা হয় এখানে। এই চ্যানেলের একটি ভিডিও দেখা (ভিউ) হয়েছে আট কোটিবারের বেশি।

এই চ্যানেলের রান্নার কাজ করেন কয়েকজন নারী। তাঁদের সবাই গৃহিণী। আছেন বউ-শাশুড়ি, সম্পর্কে কেউ আবার জা। সেদিন একরঙা পোশাক পরে এই নারীদের কেউ মাংস বা চাল ধুচ্ছিলেন, মসলা বাটার কাজ করছিলেন কেউ কেউ। মজলিশি রান্নায় যেমন হাঁকডাক আর রাঁধুনিদের খুনসুটি আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে, তেমনই মনে হলো কাছে ভিড়ে। ডিএসএলআর ক্যামেরা কাঁধে আশাদুল ইসলাম নামের এক তরুণ ধারণ করছেন সেসব মুহূর্ত।

একসময় সব উপকরণ প্রস্তুত। রাঁধুনি রূপা খাতুন সসপ্যানে রাখা মাংসে পরিমাণমতো মসলা-নুন-তেল নিলেন, ক্যামেরা কাছে ভিড়তেই বল উঠলেন, ‘এখন আস্তে আস্তে গোশত মাখাতি হবি।’ ভিডিও করা হলো তাঁর মাংস মাখানো।

রান্না তদারক করছিলেন লিটন আলী। তিনিই ইউটিউবে অ্যারাউন্ড মি বিডি ও ভিলেজ গ্র্যান্ডপা’স কুকিং চ্যানেল দুটির মালিক।

উনুনে তেহারির সসপ্যান উঠে গেছে। কথা বলতে বসেন লিটন আলী, ‘সত্যি বলতে, পরিকল্পনা করে কিছুই করিনি।’ পরিকল্পনা করে যে তিনি করেননি, তা শুরুর ভিডিও দেখে বোঝা যায়। পথের ধারে মাটির পাত্র বিক্রির দোকান, গার্মেন্টসে জিনস তৈরির মুহূর্ত, মাছবাজার আর মাছ কাটার দৃশ্য, গ্রামে মাছ ধরা, সাপের খেলা, হাটের হইহুল্লোড়—শুরুতে এসবই ভিডিও করে রাখতেন চ্যানেলে। ‘তাই নাম দিয়েছিলাম—অ্যারাউন্ড মি বিডি।’

গ্রামে অনেক তরুণের কাছে লিটন আলী আদর্শ। পেশায় তিনি সফটওয়্যার প্রকৌশলী। পড়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট)। রাজধানীর মিরপুরে এক মামার সঙ্গে তাঁর যৌথ মালিকানার তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও আছে। গ্রামে গেলে অনেকে ছুটে আসতেন লিটনের কাছে, তাঁদের জন্যও কিছু করার কথা বলতেন।

লিটন আলী বলেন, ‘ইউটিউব চ্যানেল শখের বশে চালু করলেও পরবর্তী সময়ে আয়ের বিষয়টি মাথায় আসে। তখন আমার কাছের মানুষদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করি।’

আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অ্যারাউন্ড মি বিডির কাজ। হাল ধরেন লিটনের মামা দেলোয়ার হোসেন। শুরুতে কিছুদিন গাঁটের পয়সা খরচ করে রান্নার আয়োজন করতেন। শিমুলিয়ায় ধারণ করা ভিডিও সম্পাদনার কাজ হতো ঢাকায়। এখনো তা-ই হয়। শুরুর মাস কয়েকের মধ্যে গ্রামীণ জীবনের ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে যায়। বিদেশি রান্নাবিষয়ক জনপ্রিয় অনেক ফেসবুক পেজে শেয়ার হয় অ্যারাউন্ড মি বিডির ভিডিও। শিমুলিয়ায় ছুটে আসেন ‘বেস্ট এভার ফুড রিভিউ শো’ চ্যানেলের সানি সাইড, যিনি খাবারের পর্যালোচনা করেন নিয়মিত। দেশে যাঁরা খাবার নিয়ে আলোচনা করেন, তাঁদের অনেকেও আসেন। হু হু করে বাড়তে থাকে চ্যানেলের গ্রাহকসংখ্যা (সাবস্ক্রাইবার)। এই ইউটিউব চ্যানেলেও আয় বাড়তে থাকে।

লিটন আলী বলেন, ‘আমাদের দর্শকদের বড় অংশ ভারতের। আছে যুক্তরাষ্ট্রেও। কোন দেশ থেকে ভিডিও দেখা হচ্ছে, সেটাও প্রভাব ফেলে আয়ের ওপর। এ আয় থেকেই রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা, চারজন ভিডিওগ্রাফার, রাঁধুনিসহ প্রায় ৫০ জন মানুষের বেতন ও সম্মানীর ব্যবস্থা হয়ে যায়।’

ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে স্বপ্নের কথাও বললেন তিনি, ‘শিমুলিয়া এখন অনেকের কাছে ইউটিউব গ্রাম নামে পরিচিতি পেয়েছে। পরিকল্পনা ছাড়া শুরু করেছিলাম। এখন গুছিয়ে কাজ করছি। আরেকটি চ্যানেল খুলব, সেটায় শুধু বিচিত্র বিষয়গুলো থাকবে। আরও মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’

তাঁরা এলেন থালা-বাটি হাতে
আলাপ শেষে লিটন আলীর সঙ্গে শিমুলিয়া গ্রাম ঘুরতে বেরোলাম। গ্রামের কোথায় কোন আয়োজন হয়েছে, তা-ই তিনি দেখালেন। পাশের গ্রামে যেতেই দৃষ্টি কাড়ল হাতি, কচ্ছপ, ডাইনোসর। এসব বাঁশ-খড়ের তৈরি। দেখলাম একটি পুকুরের মধ্যে বানানো হচ্ছে ঘর। এই ঘর গড়ার ভিডিওই ছাড়া হবে ইউটিউবে।

পাশের গ্রাম থেকে মোল্লাপাড়ায় ফিরতে চারটা বেজে গেল। থালা-বাটি হাতে মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকল। লিটন আলী বলেন, ‘আগে রান্নার আয়োজন দেখতেও মানুষ আসত। প্রায় প্রতিদিনই রান্না হয় বলে মানুষের আর আগ্রহ নেই। সবাই খাওয়ার সময় চলে আসেন।’

মিনিট বিশেকের মধ্যে প্রায় ২০০ জন হাজির। প্রথমে শিশুদের সারি, তারপর নারী, পরের সারি পুরুষদের। মোছা. বেগম, জোবেদা খাতুন, মদিনা খাতুন, রাশেদা খাতুনরা খাবার বিতরণ শুরু করলেন। ক্যামেরা ছুটল তাঁদের সঙ্গে।

কেউ সেখানে বসে খেলেন, কেউ খাবার নিয়ে চলে গেলেন বাড়িতে। ওদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় তিন দাদু ছুটলেন কুমারখালী উপজেলায়। সেখানকার অসহায়দের হাতে তাঁরা তুলে দেবেন বিরিয়ানির প্যাকেট। পাশে দাঁড়ানো লিটন আলী হাত নাড়িয়ে তাঁদের বিদায় জানিয়ে বলেন, ‘গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করতে পারছি, অসহায় মানুষদের মুখে সামান্য খাবার তুলে দিতে পারছি, এর চেয়ে আনন্দের কিছু নেই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *