ছেলে ব্যারিস্টার তারপরেও মশার আখড়া থেকে গিয়াস উদ্দিনের ঠাঁই হলো বৃদ্ধাশ্রমে

বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন গিয়াস উদ্দিন। খেয়ে না খেয়েই পার করেছেন ৭২ বছর। সঠিক যত্নের অভাবে এখন তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন। কখনও বলেন, স্ত্রী-সন্তান কেউ নেই তার। ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করেছেন। এরপর এইচএসসি। ব্যাংকেও নাকি চাকরি করেছেন। আবার কখনও বলেন, ময়মনসিংহের নান্দাইলে তার জন্ম। অনেকদিন রিকশাও চালিয়েছেন।

কিন্তু সচেতন মহল বলছেন, অযত্ন আর অবহেলায় হয়তো স্মৃতিশক্তি ঠিক নেই তার।

ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া না করা ও বয়সের ভারে শরীরের চামড়াগুলো ঝুলে গেছে গিয়াস উদ্দিনের। তবে সঠিক যত্ন পেলে হয়তো সুস্থ হয়ে জীবনের শেষ সময়টুকু শান্তিতে কাটাতে পারবেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহের কলেজ রোড রেলক্রসিংয়ের সাথে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের এক কোণে খোলা জায়গায় ছোট একটা চৌকিতে থাকার সুযোগ হয়েছিল গিয়াস উদ্দিনের। সেখানে থাকলেও ঠিকমতো খাবার জুটতো না তার কপালে। মশার কামড়ে গুনে গুনে সময় পাড় করতেন তিনি।

যদি থাকে নসিবে, আপনা আপনি আসিবে। এমন প্রবাদ মিলে গিয়েছে বৃদ্ধ গিয়াস উদ্দিনের বেলায়। হঠাৎ আলমাস হোসাইন শাজা নামের এক শিক্ষকের নজরে আসার পর অসহায় তার ঠাঁই হলো সারা মানবিক বৃদ্ধাশ্রমে।

স্থানীয় ফ্লোরেন্স কলেজের লেকচারার আলমাস হোসাইন শাজা জাগো নিউজকে জানান, গত ৫ আগস্ট আসরের নামাজের পর দুইজন বড় ভাইয়ের সাথে কলেজ রোড রেলক্রসিংয়ের দিকে সাক্ষাতের জন্য যাই। তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থাকার কারণে নগরীর কলেজ রোড রেলক্রসিংয়ের সাথে ওয়ার্ড কার্যালয়ে বসে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে থাকি। সেখান থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে ওই কার্যালয়ের এক কোণে থেকে হঠাৎ ছোট্ট একটা শব্দ ভেসে আসে ‘ওই’। শব্দ শুনে কাছে যেতেই এক বৃদ্ধ পাঁচ টাকার একটি কয়েন হাতে নিয়ে বললেন, একটা কয়েল আইন্না দেও বাবা। মশায় খাইয়ালতাছে।

তিনি জানান, সত্যিই ওই বৃদ্ধের আশেপাশে অন্ধকার কূপের মতো জায়গাটিতে মশায় ভরপুর। নিজের হাত-পা স্বাভাবিকভাবে উঠাতে-নামাতে পারেন না তিনি। মশার উপদ্রব তাকে অসহনীয় কষ্ট দিচ্ছে।

আলমাস হোসাইন শাজা আক্ষেপ করে বলেন, শত-সহস্র কোটিপতি মানুষের বাস আমাদের এ দেশে। আলিসান ফ্ল্যাট বাড়ি আর বস্তা বস্তা টাকাকড়ির মালিকদের খুব একটা অভাব নেই। তার মধ্যে দুই একজন অসহায় মানুষের সামান্য অন্ন সংস্থানের জন্য বা একটু মাথা গোঁজার জন্য এমন অসহায় অবস্থা সত্যিই পীড়াদায়ক। শেষ জীবনে এ অসহায় বৃদ্ধের জন্য স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করার জন্য দায়িত্বশীল কর্তা ব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় একটি সংস্থার সভাপতি সুমী সরকার জাগো নিউজকে বলেন, অসহায় গিয়াস উদ্দিন অনেক বছর খোলা জায়গাতেই বসবাস করে আসছিলেন। তার শারীরিক অবস্থা খারাপ দেখেই আলমাস হোসাইন শাজার কাছ থেকে জেনে তার অসহায়ত্বের বিষয়টি সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালককে জানানোর পরে শুক্রবার দুপুরে তিনি এসে অসহায় বৃদ্ধকে তার বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই দিয়েছেন।

ময়মনসিংহের ভালুকার ভান্ডাবের (দাইড়াপাড়া) সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক আব্দুল মালেক জাগো নিউজকে বলেন, ওই বৃদ্ধ দীর্ঘদিন ঠিকমতো না খেয়ে থাকার জন্য শরীরের চামড়াগুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তিনি পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন। একেকসময় একেক কথা বলছেন। সঠিক পরিচয় দিতে পারছেন না। তার কষ্টে থাকার ঘটনা জানার পরই বিকেলে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে এসেছি।

তিনি বলেন, বৃদ্ধাশ্রমে যারা আসে তারা এমনিতেই অসহায় থাকে। আমার বৃদ্ধাশ্রমে ১৩ জন বৃদ্ধা আছে। তাদেরকে নিজ পরিবারের সদস্যদের মতো যত্ন করে রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *