একটি শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য জন্ম দেয়া হলো আরেক শিশুকে

এক শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য জন্ম দেয়া হলো আরেকটি শিশু। শুনতে অবাক লাগলেও এমনই এক ঘটনা ঘটেছে ভারতে।

বিবিসি’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, প্রথমবারের মতো দেশটিতে একটি পরিবারের এক সন্তানকে বাঁচাতে পরিবার নতুন সন্তানের জন্ম দিল। আর এই পরিবারটি থাকে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের সবচেয়ে বড় শহর আহমেদাবাদে।

ওই পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান কাভ্যিয়া সোলাঙ্কির জন্ম ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে। গত মার্চ মাসে দেড় বছর বয়সে তার দেহ থেকে অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করে তার সাত বছর বয়সী বড় ভাই অভিজিৎ-এর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়।

অভিজিৎ থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছিল। এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি দেখা দেয়। যার ফলে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পায়। এ কারণে অভিজিৎকে প্রচুর রক্ত দিতে হতো। প্রতি ২০/২২ দিন পর পর তাকে ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত দেয়ার প্রয়োজন পড়ত। তার বয়স ছয় বছরে পৌঁছানোর আগেই তাকে ৮০ বার রক্ত দেয়া হয় বলে জানান তার পিতা সাহদেভসিন সোলাঙ্কি।

তিনি বলেন, আমার বড় কন্যার পর অভিজিৎ-এর জন্ম হয়। আমরা খুব সুখী একটা পরিবার ছিলাম। তার বয়স যখন মাত্র ১০ মাস তখন আমরা জানতে পারলাম যে সে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। আমরা সবাই ভেঙে পড়লাম। সে খুব দুর্বল ছিল। তার রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিক মতো কাজ করতো না এবং এর ফলে সে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তো।

আর যখন আমি জানতে পারলাম যে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই তখন আমার কষ্ট দ্বিগুণ হয়ে গেল, বলেন সাহদেভসিন সোলাঙ্কি।

সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ জানতে তিনি এই অসুখের ওপর প্রচুর লেখাপড়া করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে এর কী ধরনের চিকিৎসা আছে সেটা জানতেও তিনি মোটামুটি গবেষণা চালান। এক পর্যায়ে তিনি জানতে পারেন এই রোগ থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠার জন্য একটি চিকিৎসা আছে। আর সেটি হলো অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন। তখন তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিতে লাগেন। কিন্তু সমস্যা হলো এই পরিবারের আরো যারা সদস্য আছে তাদের কারো অস্থিমজ্জার সঙ্গে অভিজিৎ-এর অস্থিমজ্জা মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি তার বড় বোনের সাথেও মিল পাওয়া গেল না।

অভিজিৎ এর পিতা ২০১৭ সালে একটি লেখা পড়েন যেখানে ‘জীবন রক্ষাকারী’ ভাই-বোনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কারো শরীরে অঙ্গ, কোষ বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের জন্য উপযোগী করে ওই ব্যক্তির ভাই অথবা বোনের জন্ম দেয়ার কথা। তখন তিনি এ বিষয়ে আরো বেশি কৌতূহলী হন। পরে ভারতের একজন প্রখ্যাত ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ ড. মনীষ ব্যাঙ্কারের শরণাপন্ন হন। সন্তান অভিজিৎ-এর চিকিৎসার জন্য থ্যালাসেমিয়া-মুক্ত ভ্রূণ তৈরির জন্য তিনি তখন ওই চিকিৎসককে চাপ দিতে লাগলেন।

এ বিষয়ে সোলাঙ্কি বলেন, তারা ‘জীবন রক্ষাকারী’ ভাই-বোন জন্ম দেয়ার পথ বেছে নিয়েছেন কারণ তাদের কাছে এছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

তিনি আরো বলেন, কাভ্যিয়ার জন্মের পর আমাদের আরো ১৬ থেকে ১৮ মাস অপেক্ষা করতে হলো যাতে তার ওজন বেড়ে ১০/১২ কেজি হয়। তার পর এই মার্চ মাসে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা হলো। তার পর আমরা আরো কয়েকমাস অপেক্ষা করলাম অভিজিৎ-এর শরীর কাভ্যিয়ার অস্থিমজ্জা গ্রহণ করেছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। অবশেষে প্রতিস্থাপনের পর সাত মাস চলে গেছে এবং এর পর অভিজিৎকে আর কোনো রক্ত দিতে হয়নি। সম্প্রতি আমরা তার রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছি। তার হিমোগ্লোবিন এখন ১১ এর উপরে। ডাক্তাররা বলেছেন ও সুস্থ হয়ে গেছে।

বর্তমানে কাভ্যিয়া ও অভিজিৎ তারা দুজনেই পুরোপুরি সুস্থ বলে জানান তিনি। কাভ্যিয়ার আবির্ভাব তাদের জীবন আমূল বদলে দিয়েছে।

ভারতে এই প্রযুক্তিটি গত কয়েক বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এই প্রথম এর সাহায্যে দেশটিতে ‘জীবন রক্ষাকারী’ বোনের জন্ম দেয়া হলো।

উল্লেখ্য, এ রকম ‘জীবন রক্ষাকারী’ ভাই অথবা বোন জন্ম দেয়ার ঘটনা প্রথম ঘটেছিল ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে। তার নাম ছিল অ্যাডাম ন্যাশ। ছয় বছর বয়সী বোনের চিকিৎসার জন্য তাকে জন্ম দেয়া হয়েছিল।

Author: Rijvi Ahmed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *