বড়লোক নয়, ছিন্নমূলের ঘর বানিয়ে বুয়েট স্থপতি রিজভীর বিশ্বজয়

টিভি সিনেমায় নয়, বাস্তব জীবনের নায়কের স্বীকৃতি পেয়েছেন চার বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী। জাতিসংঘ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবিকতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিজীবনে সত্যিকারের যে নায়কদের তুলে ধরেছে, তাঁদের একজন বাংলাদেশি স্থপতি রিজভী হাসান। অবকাঠামোর নকশা তো অনেকেই করেন। কিন্তু মানুষের, বিশেষ করে উদ্বাস্তু বা উদ্বাস্তুর মতো পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের জীবন, চিন্তা-ভাবনা বদলে দেওয়ার মতো অবকাঠামো গড়ে বিশ্বের নজর কাড়তে পেরেছেন কয়জন! এ ক্ষেত্রে রিজভী হাসান সত্যিই ব্যতিক্রম। বড়লোকের জন্য নয়, ছিন্নমূলের ঘর বানিয়ে বুয়েট স্থপতি রিজভীর বিশ্বজয়। বুধবার বিশ্ব মানবিক দিবস উপলক্ষে মানবিক কাজে অনুপ্রেরণা জোগাতে জাতিসংঘ তাদের ‘রিয়েল লাইফ হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এদের প্রত্যেকেই মানবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করে জাতিসংঘ। এর আগেই বিশ্বের নজর কেড়েছে স্থপতি রিজভী হাসান। কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর কাজ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে যুক্তরাজ্যের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায়। প্রতিবেদনটি করেছেন সাংবাদিক ও স্থাপত্য সমালোচক রোয়ান মুর।

শিরোনাম ‘বিশ্বের সেরা দশ নতুন স্থাপত্য প্রকল্প’। গত ৯ মে প্রকাশিত সে প্রতিবেদনে রোয়ান মুর যে ১০টি স্থাপত্য প্রকল্পের কথা লিখেছেন, তার একটি বাংলাদেশি তরুণ স্থপতি রিজভী হাসানের। রিজভীর প্রকল্পের নাম ‘বিয়ন্ড সারভাইভাল: এ সেফ স্পেস ফর রোহিঙ্গা উইমেন অ্যান্ড গার্লস’। নারী ও কিশোরীবান্ধব স্থাপত্য প্রকল্পটি সম্পর্কে রিজভী বললেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে শরণার্থী হিসেবে আসা রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের আপন আঙিনা হিসেবে কয়েকটি সেন্টার গড়েছি আমরা।’ এই কেন্দ্রগুলোর স্থাপত্য নকশায় রিজভীর যে ভাবনা, সে জন্যই তাঁকে সম্মান জানিয়েছে ইউএনওসিএইচএ। সংস্থার ওয়েবসাইটে তাঁকে পরিচয় করিয়েছে রিয়েল লাইফ হিরোজ বা বাস্তবের নায়ক হিসেবে। রিজভী হাসান এখন স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইওএম) হয়ে। আছেন কক্সবাজারে। তিনি জানান, তাঁর গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈর হলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকার মালিবাগে। মতিঝিল আইডিয়াল থেকে এসএসি পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে। তারপর বুয়েটে পড়াশোনা করে স্থপতি হিসেবে কাজে নামেন। তবে বুয়েটে থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালে মুখোমুখি হন কেনিয়ান আর্কিটেক্ট এরিক সেজালের। সেজাল এসেছিলেন এক কনফারেন্সে। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল রিজভীর। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনেন সেজালের কথা। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন সেদিন থেকেই। ২০১৭ সালে স্নাতক শেষ করে চলে যান ঝিনাইদহ। সেখানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবিরের একটি প্রকল্পে কাজ করেন। এরপর ব্র্যাকের সঙ্গে শুরু করেন প্রকল্পের কাজ। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে। রিজভী তাঁর প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিসেফ, ইউএনএইচসিআর, ইউএনওমেন, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য সাতটি সেন্টার গড়েছেন। রিজভীর নকশায় গড়া কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার আলুখালী শরণার্থীশিবিরের একটি কমিউনিটি সেন্টার। দেখতে খুদে স্টেডিয়ামের মতো। গ্যালারির তো অংশটি ঘর। মাঝে ছোট খোলা আঙিনা। বাঁশের কাঠামোতে তৈরি ঘরের ছাউনি শণের। ঘরের ভেতরে রংবেরঙের নকশা। পাটি বিছিয়ে একদল কিশোরী হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। একটি ঘরে কয়েকজন নারী সেলাই মেশিন চালাচ্ছেন। রিজভী হাসানের স্থাপত্য নকশায় তৈরি একটি সেন্টার রিজভী বলেন, ‘উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অনেক কর্মসূচি চলে এসব কেন্দ্রে। এখানে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসহায়তা দেওয়া হয়, দেওয়া হয় কর্মমুখী প্রশিক্ষণ। শিশুদের জন্যও কাজ হয়। এখন যেমন করোনাকালীন জরুরি সেবার জন্যও কেন্দ্র ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে তৈরি হচ্ছে মাস্ক।’ এই কেন্দ্রগুলোতে শরণার্থী নারীরা স্বচ্ছন্দে যান নিজেদের সমস্যা আর সম্ভাবনার কথা বলতে। তাই নারী ও কিশোরীরা যেন নিজেদের জায়গা ভাবেন, সেভাবেই নকশা করেন রিজভী। তাঁর স্থাপত্য নকশা ভাবনায় প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা।

রিজভী বলেন, ‘নকশা এমনভাবে করেছি, যেন বাইরে থেকে বোঝা না যায় ভেতরে কী আছে। অন্দরসজ্জাও বেশ বর্ণিল।’ এই স্থাপত্যকাঠামো তৈরি করা হয়েছে ঝড়প্রবণ এলাকার কথা মাথায় রেখে। ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশ, শণসহ স্থানীয় উপকরণ। রিজভীর নকশায় গড়া একটি কমিউনিটি সেন্টার রিজভীর বাঁক দেওয়া দুজন এরিক সেজাল ও খন্দকার হাসিবুল কবির। দুজনই বাঁক বদলে দেন রিজভীর। বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন খন্দকার হাসিবুল কবির। একসময় ছিলেন রিজভীর শিক্ষক। রিজভী বলেন, ‘হাসিবুল কবির স্যারের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। একজন আদর্শ শিক্ষক বলতে যা বোঝায় তার সব গুণই আছে আমার এই শিক্ষকের মাঝে। এরিক সেজাল ২০১৪ সালে বাংলাদেশে এসে বলেছিল এখানকার কাজের সুযোগ-সুবিধার কথা। সেই কথা আমার মনে গেথে ছিল এবং সেই কথা ধরেই আমি আমার স্বপ্নকে নতুন করে সাজাতে শুরু করি। অন্যভাবে বলা যায়, তিনি আমার মনের কথাগুলোই বলে পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন আমায়। এরপর নেমে পড়ি কাজে। আমি আসলে মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। আমাদের বিসিএস গ্রুপে যোগ দিন আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *