দেশের এই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বিয়ে চিকিৎসা ও হজের জন্য টাকা পায়

গত রমজানে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করেন নাজির হোসেন। তাকে নেয়া হয় ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে। অসুস্থ হয়ে প্রায় দুই মাস হাসপাতালে ছিলেন। পরে ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয় তার। সবমিলে দুই মাসে খরচ হয় ২০ লাখ টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত নাজির হোসেনকে বাঁচানো যায়নি।

নাজির হোসেন ছিলেন মৌলভীবাজারের ‘বিলাস ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের’ ম্যানেজার। চিকিৎসায় এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য ছিল না তার। তার চিকিৎসার পুরো খরচ দিয়েছে বিলাস কর্তৃপক্ষ।

শুধু কর্মীদের চিকিৎসার খরচ নয়; প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানের খরচে জ্যেষ্ঠ কর্মীদের হজে পাঠানো হয়। একবার কেউ প্রতিষ্ঠানে ঢুকলে চাকরি করতে পারেন আজীবন। অর্থাৎ এখানে কারও চাকরি যায় না।

জ্যেষ্ঠ কর্মীদের বেতন সর্বোচ্চ। কারণ প্রতিষ্ঠানের নিয়মে বছর বছর কর্মীদের বেতন বাড়ে। পাঁচ হাজার টাকায় যার চাকরি শুরু হয় তার বেতন একসময় ৪০ হাজার হয়ে যায়। যাদের ১০-১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি হয় কয়েক বছরে তাদের বেতন লাখ টাকা হয়ে যায়। বিপদে-আপদে সবসময় কর্মীদের পাশে থাকে বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের প্রাণ, কর্মীবান্ধব একটি পরিবার।

প্রায় ১০০ বছর আগে মৌলভীবাজারের সাইফুর রহমান সড়কে গড়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠান। শত বছর আগে ‘ইয়াওর মিয়া’ যে কাটা কাপড়ের দোকান দিয়েছিলেন সময়ের বিবর্তনে সেটি আজ মৌলভীবাজারের বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। যার নাম ‘বিলাস ডিপার্টমেন্টাল স্টোর’।

মৌলভীবাজার শহর এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বিলাসের ব্রাঞ্চ রয়েছে। পাশাপাশি মালিক এগ্রো, টি-ভিলা লাক্সারি রিসোর্টসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আছে বিলাসের। সবমিলে তার কর্মচারী সংখ্যা ৩৭৫ জন। তবে এখানে কর্মী হয়ে একবার ঢুকলে সারাজীবন চাকরি খুঁজতে হয় না। এমনকি যে কর্মী বয়সের কাছে হেরে একসময় অবসরে যান তখন তার পরিবর্তে পরিবার কিংবা আত্মীয়কে চাকরি দেয়া হয়। অনেক সময় বাবার চাকরির স্থলে ছেলে সুযোগ পায়।

ইয়াওর মিয়ার প্রতিষ্ঠিত শত বছরের এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে পরিচালনা করছেন সুমন আহমদ এবং তার ভাই মো. সোহাদ। তারা দুজন ইয়াওর মিয়ার নাতি। ইয়াওর মিয়া মারা যাওয়ার পর তার ছেলে আব্দুল মালিক এই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে সুমন আহমদ হাল ধরেন।

দাদা-ছেলে-নাতি তিন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব গেলেও প্রতিষ্ঠানের কর্মীবান্ধব নীতি অটুট রয়েছে। আবার অনেকে নিজের চাকরি থাকা অবস্থায় ছেলেকে চাকরি দিয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানে।

বিলাসের কর্মী আজিজ মিয়া (৭০) বলেন, বয়স হয়েছে। এখন আর তেমন কাজ করতে পারি না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভালোবাসায় চাকরি ছাড়তে পারি না। প্রতিষ্ঠানও আমাকে ছাড়ে না। তাই এখনও কাজ করছি। মাসে মাসে বেতন পাচ্ছি। এর মধ্যে নিজের ছেলেও নিয়ে এসেছি। এখানে আমরা যারা কাজ করি নিজেদের পরিবার নিয়ে কাউকে চিন্তা করতে হয় না। কারণ আমার মতো সবারই অধিকার আছে। কেউ চাকরি ছাড়লে তার পরিবারের সদস্য চাকরি পাবে। কাজেই চাকরি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই কারও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানের খরচে জ্যেষ্ঠ এক কর্মীকে হজে পাঠানো হয়। গত বছর প্রতিষ্ঠানের খরচে হজে যান জাবেদ আহমদ।

তিনি বলেন, আমি প্রাণভরে দোয়া করি, এই প্রতিষ্ঠান অনেক বড় হোক। প্রতি বছর আমরা নিজেরাই ঠিক করে দেই কে হজে যাবেন। নিজেরা বাছাই করে ওই কর্মীর নাম প্রতিষ্ঠান পরিচালকের কাছে দেই। পরে তিনি পাসপোর্ট-ভিসাসহ যাবতীয় কাজ শেষ করে ওই কর্মীকে হজে পাঠান। এয়ারপোর্টে যাওয়া এবং হজ থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত সব খরচ বহন করে প্রতিষ্ঠান।

‘শুধু তাই নয়; কর্মীদের ভাই-বোন বা ছেলে-মেয়ের বিয়ে থেকে শুরু করে যেকোনো অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে আমাদের প্রতিষ্ঠান’ জাগো নিউজকে বলছিলেন বিলাসের কর্মী জাবেদ আহমদ।

বিলাসের একাধিক কর্মী জানান, সহযোগিতার বিষয়টি কোনো নিয়মের মধ্যে নেই। যেহেতু সবার আর্থিক অবস্থার খবর প্রতিষ্ঠান রাখে; তাই যার যেমন সাহায্য দরকার তাকে সেভাবে সাহায্য করে প্রতিষ্ঠান। পারিবারিক যেকোনো বিষয় মালিকের সঙ্গে সহজে শেয়ার করতে পারেন বিলাসের কর্মীরা।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের দোকানপাট, শপিংমল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ অবস্থায় কর্মহীন দোকানের কর্মচারীরা। বিলাসের কর্মীদেরও কাজ বন্ধ। তবে প্রতি মাসে ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন বিলাসের কর্মীরা। বেতন দেয়ার পাশাপাশি রমজানে পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী কর্মীদের উপহার দিয়েছে বিলাস। করোনা দুর্যোগে ঘরে বসে বেতন পেয়ে আবেগাপ্লুত বিলাসের কর্মীরা।

বিলাসের কর্মী মঞ্জু সরকার জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ। কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। তারপরও আমাদের বেতন দিয়েছেন। আমাদের প্রতিষ্ঠানের তুলনা হয় না, আমাদের মালিক অনেক উদার মানুষ। আমাদের মালিকের দীর্ঘায়ু কামনা করি। আমরা চিন্তা করে রেখেছি; করোনার পর দ্বিগুণ পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লোকসান পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করব আমরা।

‘বিলাসের কর্মীদের জন্য আরও বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা আছে। এসব সুযোগ-সুবিধা প্রচার না করাই ভালো। কারণ বিলাস সবসময় কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠান’ জাগো নিউজকে বলছিলেন পরিচালক সুমন আহমদ।

তিনি বলেন, কর্মীরা আমাদের পরিবারের সদস্য। পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু করলে তা প্রচার করা কি ঠিক? আমি যদি বলি ওই কর্মীর বিয়েতে বা তার মেয়ের বিয়েতে এই দিয়েছি, সেই দিয়েছি। এই নিউজ যখন মেয়ের শ্বশুরের পরিবার দেখবে বা অন্য মানুষ দেখবে তখন বলবে সাহায্য নিয়ে বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এসব কর্মী তো আমার পরিবারের সদস্য। এদের লজ্জা মানেই তো আমার লজ্জা। পরিবারের সদস্যকে কিছু দেয়া সাহায্য নয়; এটি তাদের অধিকার।

সুমন আহমদ বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন তাদের জন্য আমার পরিবার ও আমাদের সবার জীবন সুন্দর। আমাকে ভালো থাকতে হলে কর্মীদের ভালো রাখতে হবে। আমি সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি কর্মীদের ভালো রাখার। করোনা সঙ্কটে আমরা খুব মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখছি। যদিও ব্যবসায়িক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আমরা। তবুও কর্মীদের বেতন দিচ্ছি ঠিকমতো। সঙ্গে খাদ্যসামগ্রী দেয়া হয়েছে তাদের। তারা তো আর অনাহারে থাকতে পারে না। আমি কর্মীদের পাশে সবসময় আছি।

মৌলভীবাজারের বৃহৎ এই প্রতিষ্ঠান শুধু নিজেদের কর্মীদের মধ্যে নয়; দেশের যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করে যাচ্ছে। চলমান করোনা সঙ্কটেও বিভিন্ন ফান্ডে দান করছেন প্রতিষ্ঠানের মালিক। প্রতিষ্ঠানের দুই ভাই বিভিন্ন এলাকায় নীরবে ত্রাণ বিতরণ করছেন। ’

গতকাল শনিবার তাদের দেখা যায়, রাজনগরের হাওর এলাকায়। জিপগাড়ির পেছনে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে দুই ভাই ছুটে চলছেন। পথে পথে মানুষের হাতে হাতে খাবারের প্যাকেট তুলে দিচ্ছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *