৩৫ বছর ধরে খেয়ে না খেয়ে চলছে সালিক মিয়ার জীবন

দৈনিক মজুরিতে বেত দিয়ে ফার্নিচারসহ আসবাবপত্র তৈরির কাজ করেন সালিক মিয়া (৫৮)। এ কাজটি তিনি চার দশক ধরে করে আসছেন। পরিবার নিয়ে বসবাস করেন সিলেট নগরের বেতবাজার সংলগ্ন ঘাসিটুলা এলাকায়।

ছয়জনের পরিবারের মাসিক খরচ ১৫ হাজার টাকার মতো। করোনা আসার পর থেকে গত ৬ মাসে কাজ পেয়েছেন মাত্র ১০ দিন। আয় হয়েছে মাত্র ৪ হাজার টাকা। অথচ সংসার চালাতে তার এই ছয় মাসে চলতে টাকার প্রয়োজন ছিল প্রায় ৯০ হাজার টাকার। তাই ধারদেনা আর খেয়ে না খেয়ে চলছে সালিক মিয়ার সংসার।

করোনার পর থেকে বেতের ফার্নিচারের চাহিদা কমে যাওয়ায় কারখানা মালিকদের কাছ থেকে আর কাজের ডাক পান না সালিক মিয়া। এমনিতেই ছয় সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। করোনা মহামারিতে এ জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় অনেকটা নিরুপায় তিনি।

সালিক জানান, এপ্রিলের প্রথম দিকে সিলেটে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে চলেছে এমন অবস্থা। এখন সামান্য সাহায্য আর ধার করা টাকায় কোনো মতে খেয়ে না খেয়ে চলছেন। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৪০০-৪৫০ টাকা মজুরিতে মাসে অন্তত ২০ দিন কাজ পেতেন। তারপরও প্রায় ৩৫ বছর ধরে এভাবেই ধার দেনা করে চলছে তার জীবন সংসার।

৪ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে কোনো মতে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন সালিক মিয়া। জানালেন টাকা পয়সার অভাবে দুই মেয়ে ও এক ছেলের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। তাদের প্রাথমিক শিক্ষার পরই স্কুলজীবনের সমাপ্তি হয়েছে টাকার অভাবে। এখন দুই মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত থাকলেও টাকার অভাবে মেয়েদের বিয়ে দিতে পারছেন না তিনি।

সালিক বলেন, যেখানে ছেলে-মেয়েদের মুখে ঠিকমতো তিন বেলা ভাত তুলে দিতে পারছি না সেখানে মেয়েদের বিয়ে দেব কী করে। ছেলেটা এখনও কাজ করার মতো হয়নি। এ অবস্থায় নিজেও ছোটবেলা থেকে দিনমজুরের কাজ করায় এখন আর কাজ করতেও পারি না আগের মতো। শরীরটা একেবারেই চলে না। নানান অসুস্থতায় ভুগলেও ওষুধ কেনার টাকা তো নেই।

মেয়েদের বিয়ে দিতে সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহায়তা চান তিনি। তিনি বলেন, সমাজের বিত্তবানরা মানবিক কারণে আমার প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হলে হয়ত মেয়েদের বিয়ে দিয়ে তাদের জীবনের একটা গতি আনতে পারতাম।

শুধু সালিক মিয়া নয় এই করোনাকালে কর্মহীন হয়ে আছেন সিলেটের হাজার হাজার দিনমজুর। এখানে নির্মাণ, শিল্প, পরিবহন, উন্নয়নসহ নানা খাতে দিনমজুর শ্রমিক কাজ করেন। তাদের প্রতিদিনের কাজের জন্য সকালে অপেক্ষা করতে হয়।

গ্রামাঞ্চলে যোগাযোগের মাধ্যমে তারা কাজ পান। কিন্তু শহরাঞ্চলে দালালের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিদিন সকালে সিলেট নগরের নবাবরোডের রাস্তারমুখ, বন্দরবাজার ও শিবগঞ্জসহ প্রায় ৫টি স্পটে এখনও দিনমজুর শ্রমিকের হাট বসে। যার যার প্রয়োজন অনুযায়ী এই হাট থেকে শ্রমিক নিয়ে যান।

এখানে মজুরির ঠিক নেই, ঠিক নেই কর্মঘণ্টারও। এর মধ্যে করোনার কারণে শ্রমিকের চাহিদা একেবারেই কমে গেছে। বেড়েছে কাজের সন্ধানে বের হওয়া মানুষের সংখ্যা।

তবে সালিক মিয়া জানান, শ্রম হাটে গিয়ে এভাবে প্রতিযোগিতা করে কাজ নেয়ার সক্ষমতা তার নেই। এছাড়া বেত শিল্পের কাজের বাইরে অন্যকাজে তিনি পারদর্শীও নন। আর এ কুটির শিল্পের শ্রমিকের কাজের শ্রমিকদের জন্য নগরের শ্রমবাজারে শ্রম কিনতে কেউ যান না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *