‘ইউএনও স্যার রাস্তা থেকে তুলে আনি মোক ঘর দেছে’

নতুন টিনের রঙিন ঘরের সামনে সমস্ত বানুর (৬৫) চোখের কোণে চিকচিক করছে পানি। আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। চোখের কোণে জমে থাকা পানি টুপ করে পড়ে। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে নিজেকে কিছুটা সামলিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘১৫ বছর আগোত স্বামী মলচে। রাস্তার ধারোত পলিথিন দিয়া চালি তুলি আছনু। ইউএনও স্যার মোক রাস্তা থাকি তুলি আনি ঘরোত ঢুকি দেছে। মুই নয়া ঘরের মালিক হইম স্বপ্নেও ভাবো নাই।’

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার কামারপাড়া গুচ্ছগ্রামে আজ শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গেলে সমস্ত বানু এসব কথা বলেন।
সমস্ত বানুর বাড়ি উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের মিস্ত্রিপাড়া গ্রামে। তাঁর কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, সমস্ত বানুর দিনমজুর স্বামী সিরাজুল ইসলাম মারা যাওয়ার পর একমুঠো ভাতের জন্য এলাকার এ–বাড়ি ও–বাড়ি ও আশপাশের হাটবাজারে ভিক্ষা করতেন তিনি। কোনো জমি না থাকায় মিস্ত্রিপাড়া রাস্তার ধারে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে থাকতেন। সামান্য বৃষ্টি হলে বেড়ার ফাঁক গলে পানি ঢুকত। ঘর বানানোর কোনো সামর্থ্য ছিল না তাঁর। রাস্তার ধারে বসবাসই যখন নিয়তি ভাবা শুরু করলেন, তখন তারাগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিনুল ইসলাম ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি) প্রকল্পের আওতায় সয়ারের কামারপাড়ায় নির্মাণ করা গুচ্ছগ্রামে তাঁকে একটি ঘর দেন। এখন সেই ঘরে থাকছেন তিনি। তাঁর মতো আরও ৩০টি পরিবারের ঠাঁই হয়েছে ওই গুচ্ছগ্রামে। এ ছাড়া হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নে ওই মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্মাণ করা উজিয়াল গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় হয়েছে আরও ৩৫টি অসহায় ভূমিহীন পরিবারের।

তারাগঞ্জের হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের উজিয়াল গুচ্ছগ্রামে ঠাঁই পেয়েছেন এসব ভূমিহীন নারী ও পুরুষ
তারাগঞ্জের হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের উজিয়াল গুচ্ছগ্রামে ঠাঁই পেয়েছেন এসব ভূমিহীন নারী ও পুরুষ প্রথম আলো
আজ উজিয়াল গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সারি করে সাজানো চকচকে রঙিন টিনের ঘর। প্রতিটি ঘরের পেছনে নির্মাণ করা হয়েছে শৌচাগার। সৌরবিদ্যুতের আলোর ঝলকানিও চোখে পড়ে। দেখে যেন মনে হয়, পরিপাটি সাজানো ছবির মতো একগ্রাম। কথা হয়, হাড়িয়ারকুঠি গ্রামের ফজিলা বেগমের (৬৫) সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর স্বামী কপিল উদ্দিন ২০ বছর আগে মারা যান। তাঁর ছেলে নেই। দুই মেয়ে থাকলেও নিজে ভাত পান না। অন্যের বাড়িতে কাজ করে অতিকষ্টে চলত তাঁর জীবন। কোনো জমি নেই। থাকতেন বড় মেয়ের বাড়িতে। ওই প্রকল্পে ঘর পাওয়ায় তিনি দারুণ খুশি।
ফজিলা বেগম বলেন, ‘এ্যালা নয়া ঘরোত মুই শান্তিতে ঘুমাইম। কখনো ভাবো নাই মুই এমতোন ঘর পাইম। হাসিনা বেটির আল্লাহ ভালো করুক।’

ডাক্তারপাড়া গ্রামের স্বামীহারা সফি খাতুনের (৫৫) চোখেমুখেও আনন্দের ঝিলিক। তিনিও ওই গুচ্ছগ্রামে নতুন ঘর পেয়েছেন। এক যুগ ধরে খড় ও পাটকাঠি দিয়ে তৈরি পুরোনো ভাঙা ঘরে থাকতেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আগোত দ্যাওয়ার পানি আইলে মুই রাইতোত নিন পাইড়ার পাও নাই। ভাঙা দিয়্যা পানি ঢুকি গাও বিছনা ভিজি গেছলো। সারা রাইত চেতন আছনু। এ্যালা দ্যাওয়ার পানি আইলেও মোর কোনো চিন্তা নাই। নয়া ঘরোত থাকোং। এই ঘর কোনা না পাইলে এ জীবনে নয়া টিনের ঘরোত শুতি থাকার আশা মনোতে থাকি গেল হয়।’

সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আজম ও হাড়িয়ারকুঠির ইউপি চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ বলেন, ‘গুচ্ছগ্রাম দুটিতে আশ্রয় পাওয়া সবাই ভূমিহীন দিনমজুর, ভিক্ষুক। তাঁদের ঘর করার সামর্থ্য ছিল না। ঘর পেয়ে দরিদ্র মানুষেরা খুব খুশি। এতে সরকার, ইউএনওর পাশাপাশি আমরাও প্রশংসিত হচ্ছি।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবদুল মমিন বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরের ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি) প্রকল্পের অধীনে দুটি গুচ্ছগ্রামে ৬৫টি ঘর, বারান্দা, রান্নাঘর, নলকূপ ও শৌচাগার নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২২৫ মেট্রিক টন চাল। গুচ্ছগ্রাম দুটিতে রয়েছে সৌরবিদ্যুতের সুবিধাও। বিদ্যুৎ–সংযোগেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জানতে চাইলে ইউএনও আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সব সময় মানবিক কাজগুলো করতে চাই। জেলা প্রশাসক আসিব আহসান স্যারের নির্দেশনা ও পরামর্শ কাজটি করতে সাহস জুগিয়েছে। গুচ্ছগ্রাম করতে সবার সহযোগিতা পেয়েছি। যাঁরা ঘর পেয়েছেন, তাঁদের মুখের হাসি আমাকে মুগ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *