দুই সাফল্যের কাছে হার মেনেছে প্রতিবন্ধিতা

সুপ্রিয়া ও প্রিয়ন্তী দুই বোন। ছোটবেলায় একসঙ্গে হেঁটে হেঁটে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতেন। এর মধ্যেই আস্তে আস্তে তাঁরা চলাফেরার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু তাঁদের সামনে এগিয়ে চলা থেমে থাকেনি। মা–বাবার যত্ন আর প্রেরণায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা এখন স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির পাঠ নিচ্ছেন। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সুনাম কুড়িয়েছেন।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌর শহরের মধ্য মাগুরা এলাকায় একটি বাসায় ভাড়া থাকে সুপ্রিয়া সিনহা (২২) ও প্রিয়ন্তী সিনহার (১৯) পরিবার। তাঁদের মূল বাড়ি পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলার উত্তর ভানুবিল গ্রামে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মণিপুরি পরিবারের এই দুই বোনের এগিয়ে চলার শক্তি জুগিয়েছেন বাবা সুরেন্দ্র কুমার সিংহ ও মা সুশীলা রানী সিনহা। সুপ্রিয়া স্থানীয় ইয়াকুব-তাজুল মহিলা কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ এবং প্রিয়ন্তী মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে পড়েন।

সুরেন্দ্র কুমার সিংহ সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে ‘প্রসেস সার্ভার’ পদে চাকরি করতেন। গত বছরের নভেম্বরে তিনি অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) চলে যান। আর মা সুশীলা রানী সিনহা গৃহিণী। আলাপচারিতায় সুরেন্দ্র বলতে লাগলেন, প্রাইমারিতে পড়ার সময় দুজনই হেঁটে স্কুলে গেছে। এরপর হঠাৎ করে চলাফেরার শক্তি কমতে থাকে। ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসককে দেখান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধ খাওয়ান। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। একসময় দুজনই চলাফেরার শক্তি একেবারেই হারিয়ে ফেলেন। হাতেও জোর কম।

সুপ্রিয়া লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চান। প্রিয়ন্তী চান শিক্ষক হতে। সুপ্রিয়ার শখ বই পড়া ও কবিতা আবৃত্তি। প্রিয়ন্তীর শখ বই পড়া ও ছবি আঁকা।
সুরেন্দ্র কুমার বলেন, চাকরিতে থাকার সময় দুই সন্তানকে কোলে করে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দিয়ে কর্মস্থলে যেতেন। আবার ছুটি হলে কাজের ফাঁকে তাঁদের বাসায় পৌঁছে দিতেন। এখনো এ কাজটি করে যাচ্ছেন। তবে স্নাতক পর্যায়ে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয় না। করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের আগে মাঝেমধ্যে তাঁদের নিয়ে যেতেন। প্রিয়ন্তী বছরখানেক ধরে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতি মাসে প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তবে সুপ্রিয়া পান না।

সুশীলা সিনহা বলেন, দুই সন্তানকে গোসল করানো, খাওয়ানো, জামাকাপড় পরানো—সব কাজই তাঁরা করেন। একসঙ্গে সবাই আড্ডাও দেন। সুরেন্দ্র যোগ করেন, ‘ঈশ্বর দুই সন্তান দিয়েছেন। তাঁদের তো যত্ন করে বড় করে তুলতে হবে। বাবা-মায়ের তো দায়িত্ব এটা। সেটাই করে যাচ্ছি।’

সুপ্রিয়া লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চান। প্রিয়ন্তী চান শিক্ষক হতে। সুপ্রিয়ার শখ বই পড়া ও কবিতা আবৃত্তি। প্রিয়ন্তীর শখ বই পড়া ও ছবি আঁকা। আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনে তাঁরা স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বেশ কিছু পুরস্কারও পেয়েছেন। বসতঘরের এক কোণে আলমারিতে এসব পুরস্কার সাজিয়ে রাখা। দুজন ভালো গান করতেও পারেন।
সুপ্রিয়া বলেন, ‘এতটুক আসতে পারাটা মা-বাবার জন্যই। আমাদের কাজে তাঁরা কোনো ক্লান্তি বোধ করেন না। মা-বাবাই আমাদের বন্ধু।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, সুপ্রিয়া ও প্রিয়ন্তীর ব্যাপারে তিনি খোঁজখবর নেবেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *