স্কুলই সবার ভরসা, আগলে রেখেছে পুরো গ্রাম

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার বাঙ্গালী নদীর তীরে অবস্থিত গোদাগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত চার বছর ধরে নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। তবে এবারের বন্যায় স্কুলটির কিছু অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে।
প্রতিবছর স্কুলটি এখান থেকে অন্য কোথাও সরানোর জন্য নিলামের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্ত এতে আপত্তি গ্রামবাসীর, কারণ গ্রামটির ভাঙনরোধে এই স্কুল ভবনই ঢালের ভূমিকা পালন করে।

স্কুলটি সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচী ইউপির চর গোদাগাড়ী গ্রামে অবস্থিত। প্রতিবছরই ওই এলাকা বাঙ্গালী নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে। তবে ওই বিদ্যালয়ের কারণে রক্ষা পায় গোদাগাড়ী গ্রাম। স্কুলটি তাদের রক্ষায় ঢাল হিসেবে রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঙ্গালী নদীটি উত্তর পূর্ব পাশ দিয়ে চর গোদাগাড়ী গ্রাম ঘেষে দক্ষিণে বয়ে গেছে। গ্রামের উত্তরে একেবারে নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এখানে কনুইয়ের মত দুটো বাকের মাঝখানে স্কুলটি। এই কারণে এখানে নদীর পানির প্রবলতা অনেক বেশি। পানির স্রোতে স্কুল ভবনের উত্তর পাশের তলার মাটি নদীর গর্ভে চলে গেছে। এখন স্কুলের অর্ধেক অংশ ভেঙে দুমড়েমুচড়ে পড়ে রয়েছে পানিতে। পাউবোর পক্ষ থেকে ফেলা জিও ব্যাগের কল্যাণে গ্রামের পাড়ের মাটি কিছুটা আকড়ে ধরে রেখেছে। তবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা উপ সহকারী প্রকৌশলী হাসানুজ্জামান জানান, বগুড়ার বাঙ্গালী নদীর অংশের ১৯ কিলোমিটারে প্রায় ৩০টি ভাঙন প্রবন এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব স্থানে ওই প্রকল্পের আওতায় কাজ হবে। এর মধ্যে চর গোদাগাড়ী স্কুলের সামনেও প্রকল্পের কাজ রয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহফুজার রহমান এই গ্রামেরই বাসিন্দা। তিনি জানান, স্কুলে মোট ১১০ জন শিক্ষার্থী। আর তিনিসহ শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। ২০১৭ সাল থেকে তারা টিনের ঘরে পাঠদান করাচ্ছেন। তবে ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর দুই-তিন জন শিক্ষার্থী অন্য স্কুলে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, স্কুলটি অনেকবার নিলামে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু গ্রামবাসীরা এতে আপত্তি করেন। গ্রামের লোকজনের আশঙ্কা, স্কুল সরে গেলে এই গ্রামটি নদী গর্ভে বিলীন হবে।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে ওর্য়াল্ড ভিশনের সহযোগিতায় ইউএসএইড দোতলা ভবনের এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপন করে। ২০১৪ সাল থেকে এটি বাঙ্গালী নদীর ভাঙ্গনের শিকার হয়। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সময় ভবনের উত্তরপাশ হেলে পড়ে। পরে স্কুলটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

গ্রামবাসীরা বলছেন, এই স্কুলের জন্য গ্রামটি টিকে আছে। এখানে প্রতিবছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকেরা বালুর বস্তা ফেলে নদীর পাড় টিকে রেখেছে।

গোদাগাড়ি গ্রামের আব্দুস সাত্তার জানান, বাঙ্গালী নদী কয়েকবছর আগেও প্রায় দুইশ মিটার উত্তরে ছিল। নদীর ওপারে যে বাড়িঘর দেখা যায়; তা এই চর গোদাগাড়ীর অংশ। কিন্তু নদী ভাঙ্গনে এখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গ্রামের এই স্কুলের জন্য আমরা এখনও টিকে আছি। স্কুল সরানো মানে আমাদের গ্রাম থেকে চলে যেতে বাধ্য করা।

সারিয়াকান্দি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম কবীরের মতে, ‘গ্রামবাসীর শঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মত না। স্কুল নিলামের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে গ্রামবাসীরা নিলামের বিপক্ষে বরাবরই দাবি জানিয়ে আসছেন।এখন পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর তীর রক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কাজটি হলে ভাঙ্গনের শঙ্কা দূর হবে। বিদ্যালয়টিও সরানোর প্রয়োজন পড়বে না।’

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবীর বলেন, চলতি বছরেই প্রকল্পটির টেন্ডার হয়েছে। বন্যার পানি নামলেই কাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে চর গোদাগাড়ী গ্রাম ও স্কুল দুইটাই রক্ষা পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *