ছেলেকে ভালো করতে না পেরে দড়ি বেঁধে পু’লিশের হাতে তুলে দিল বাবা

মাদকাসক্ত ছেলেকে সুপথে ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা করেছিলেন বাবা ময়েন উদ্দিন। এ জন্য ছেলেকে বিয়েও দিয়েছিলেন। তবে ছেলের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একে একে চারজন স্ত্রী সংসার ছেড়েছেন। এরপরও ছেলেকে সঠিক পথে ফেরাতে পারেননি হতভাগা রিকশাচালক বাবা। নিরুপায় হয়ে আজ মঙ্গলবার ছেলের হাতে দড়ি বেঁধে বাড়ি থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে উপজেলা সদরে গিয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে দিয়েছেন। পরে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাদকাসক্ত ওই ছেলেকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের সমসপাড়া গ্রামে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে দণ্ডিত মাদকাসক্ত ওই ছেলের নাম জুয়েল রানা (৩০)। আর নিরুপায় অসহায় ওই বাবার নাম ময়েন উদ্দিন (৫৪)। তিনি ঢাকায় রিকশা চালিয়ে পরিবারের অন্ন জোগান।

রিকশাচালক ময়েন উদ্দিন জানান, তাঁর ছেলে জুয়েল রানা তিন বছর আগে থেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। এলাকার কিছু মাদকাসক্ত ছেলের সংস্পর্শে এসেই এই অধঃপতন হয় তাঁর। বিষয়টি জানার পর ছেলেকে ভালো পথে আনতে অনেক চেষ্টা করেন। এ জন্য ২০১৭ সালে ছেলেকে বিয়েও করান। তবে মাদক সেবন করে স্ত্রীকে নির্যাতন করায় ওই স্ত্রী জুয়েলকে তালাক দিয়ে চলে যান। উপায়ান্তর না দেখে প্রতিবেশীদের পরামর্শে আবারও বিয়ে দেন ছেলেকে। কিন্তু ফল উল্টো। এভাবে একে একে চারজন স্ত্রী মাদকাসক্ত জুয়েলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তালাক দিয়ে চলে যান।

ছেলেকে ভালো করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। আমি ঢাকায় রিকশা চালিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। সে টাকা সংসারের কাজে না লাগিয়ে ছেলে মাদক কিনে সেবন করত। ভালো হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চারটি বিয়ে করলেও পরে মাদক সেবনে বেপরোয়া হয়ে পড়ে। নিরুপায় হয়ে হাতে দড়ি বেঁধে প্রশাসনের কাছে তুলে দিয়েছি।

ময়েন উদ্দিন বলেন, ছেলে মাদকের টাকা জোগাড়ের জন্য পরিবারের সদস্যদের মারপিট করেন। সংসারের জিনিসপত্র ছাড়াও এলাকার লোকজনের বাড়ির মালামাল চুরি করে বিক্রি করে মাদকের টাকা জোগাড় করেন। ছেলের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পরিবার ছাড়াও এলাকার লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। সম্প্রতি ময়েন উদ্দিন ঢাকা থেকে বাড়িতে এসে ছেলেকে মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালান।

সব পথে ব্যর্থ হয়ে আজ দুপুরে তিনি পিঠমোড়া করে ছেলের হাতে দড়ি বাঁধেন। পরে গ্রাম পুলিশের সহযোগিতায় ভ্যানে করে তাঁকে নিয়ে যান ১৪ কিলোমিটার দূরে উপজেলা সদরে। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তরে নিয়ে দড়ি বাঁধা অবস্থায় ছেলেকে প্রশাসনের হাতে তুলে দেন। পরে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। আদালতের বিচারক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ইউএনও শরিফ আহম্মেদের কাছে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন জুয়েল। ইউএনও তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। পরে থানায় সোপর্দ করা হলে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আনিছার রহমান শেখ প্রথম আলোকে বলেন, জুয়েলের বাবার সঙ্গে তাঁরাও জুয়েলকে ভালো করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। নিরুপায় বাবা তাই নিজেই ছেলেকে দড়ি বেঁধে উপজেলা প্রশাসনের কাছে দিয়েছেন।

ময়েন উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেকে ভালো করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। আমি ঢাকায় রিকশা চালিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। সে টাকা সংসারের কাজে না লাগিয়ে ছেলে মাদক কিনে সেবন করত। ভালো হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চারটি বিয়ে করলেও পরে মাদক সেবনে বেপরোয়া হয়ে পড়ে। গোটা পরিবারকে অশান্তিতে রাখার কারণে নিরুপায় হয়ে হাতে দড়ি বেঁধে প্রশাসনের কাছে তুলে দিয়েছি।’

রায় ঘোষণার পর অনুতপ্ত জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা সঠিক কাজই করেছেন। সাজা খেটে বের হয়ে এসে আর মাদক সেবন করব না। ভালো হয়ে যাব।’

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বাগমারার ইউএনও শরিফ আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত জুয়েল রানার বাবা তাঁর ছেলেকে আদালতের কাছে দিয়েছেন। মাদকাসক্ত ছেলের বিরুদ্ধে পরিবারের লোকজনকে নির্যাতন ও বিভিন্ন সামগ্রী চুরির অভিযোগ করেন বাবা। আদালতের কাছে জুয়েল রানা নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। এ জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *