দরিদ্র কৃষকের মেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করলেন বাবা

এক দরিদ্র কৃষক কন্যার বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার হওয়ার বাস্তব গল্প…… (গল্পটা একটু লম্বা ধৈর্য সহকারে সম্পুর্ণটা পড়ার অনুরোধ রাখছি। আশা করি সময়টা বিফলে যাবে না।) ফরিদা সুলতানা সোনালি আমার অনার্স লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ডদের একজন। ওর বাবা হয়তো ওর নাম সোনালি রেখেছিলেন ওর সোনালি ভবিষৎ এর কথা ভেবেই। কারন তিন পুত্রের পর ১ম কন্যা যদিও তারপরে আরো ২ মেয়ে ও ১ ছেলে আসে সংসারে। তবুও ৩ ভাইয়ের পর ১ম কন্যা সন্তান আবার পরিবারের বড়

মেয়ে।(সংসারের বড় মেয়ের জন্য বাবাদের আলাদা ভালোবাসা থাকে এটা আমি আমার পরিবারেও দেখেছি) তো সোনালি সেই দরিদ্র কৃষক বাবার ১ম রাজকন্যা না কৃষককন্যা। উত্তরের জেলা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম লেংগাবাজারের আর ৫ টা মেয়ের মত বড় হতে লাগল সে। ইতিমধ্যে মায়ের হাতে পড়ালেখার হাতেখড়ি হয়ে গেল। কারন সোনালির নানা গোষ্ঠীর সবাই প্রায় উচ্চশিক্ষিত সেই সুত্রে ওর মা মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিলেন এরপরে বিয়ে হয়ে যায়। ওর যখন স্কুলে

যাবার বয়স হল গ্রামে তখন ব্রাক এনজিও পরিচালিত বিনামুল্যে স্কুল সামগ্রীসহ ব্রাক স্কুল প্রোগাম চলছিল। তো সোনালির বাবা মেয়েকে সেই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেখানে মূলত গ্রামের দরিদ্র ছেলেমেয়েরা পড়ত। সেই ব্রাক স্কুল থেকেই সে প্রাথমিকের পাঠ সমাপ্ত করে। মজার বিষয় হল সেই স্কুলের সোনালির অন্যান্য সহপাঠী গণ আর কেউই মাধ্যমিক পাস করতে পারেনি। সহপাঠিনীদের তো প্রায় সবার মাধ্যমিক পাসের আগেই বিয়েই হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক শেষ করে ও ভর্তি হয় লেংগাবাজার

বি.এস হাইস্কুলে।তবে, ততদিনে ওর পরিবারে নেমে এসেছে এক অশনিসংকেত। ওর বাবার হার্টের অসুখ ধরা পরে ২০০০ সালে অর্থ্যাৎ ও যখন প্রাথমিকের শেষ পর্যায়ে। তবুও ওর বাবা মা মেয়ের পড়ালেখায় আগ্রহ দেখে পড়ালেখা চালিয়ে যান। এরপর ২০০৪ সাল ও তখন নবম শ্রেনির ছাত্রী মরার উপর খরার ঘা এর মত নেমে আসে আরেক বিপদ।ওর মা প্যারালাইজড হয়ে যান। এতে করে সংসারের বড় মেয়ে হিসেবে সাংসারিক সব কাজ ওকেই করত হত। সংসারের কাজ + পড়ালেখা দুটোই চালিয়ে

যায় সোনালি। এভাবে সংগ্রাম করে পড়ালেখা করে ও ৪.৯৪ পয়েন্ট নিয়ে ২০০৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ হতে মাধ্যমিক পাস করে। এসএসসি পাস করে ভর্তি হয় ধর্মপুর আব্দুল জব্বার ডিগ্রী কলেজে। আর গ্রামের মেয়ে কলেজে পড়ে মানে সে বড় হয়ে গেছে। তাকে বিয়ে দিতে হবে। তখন পারিবারিকভাবে সোনালি একই গ্রামের কৃষক সন্তান মোশাররফ হোসাইনকে পড়ালেখা চালিয়ে যাবার শর্ত দিয়ে বিয়েতে রাজি হয়। এভাবে ইন্টার ১ম বর্ষেই বিয়ে হয় সোনালি ও মোশাররফ ভাইয়ের। শুরু হয় জীবনের

নতুন এক অধ্যায়ের বিবাহিত জীবন। অনেক অনেক স্বপ্ন নিয়ে সোনালি শ্বশুর বাড়িতে প্রবেশ করে।তবে সেই স্বপ্ন ভাঙ্গতে সময় লাগে না। ছোট্ট সেই মেয়েটা সংসারের কি বোঝে! ভয় আর দ্বিধা নিয়ে শুরু হল সংসার জীবন। স্বামী পড়ালেখা করাতে রাজি থাকলেও স্বামীর পরিবারের সদস্যরা বেকেঁ বসলেন তারা পরিবারের বউকে পড়ালেখা করাবেন না সাফ জানিয়ে দিলেন। তখন ওর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরল। আর এ কথা শুনে সোনালির বাবা ক্ষেপে গেলেন বললেন সংসার করতে হবেনা তুই পড়ালেখা

কর। কিন্তুু সোনালি যে হেরে যাবার পাত্রীই না তাই সে সংসার ছাড়তে রাজি হল না। কারন আমাদের সমাজে ডির্ভোসি মেয়েদেরকে অসন্মান করা হয় পদে পদে ( আমি এই বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী)। তবে পড়ালেখাও চালিয়ে যাবার পণ থাকল অটুট। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে কাজ না করে পড়ালেখা করলে জুটবে না প্রতিদিনকার আহার। শুরু হল নতুন এক যুদ্ধ। মাঝে মাঝে দুই/তিন দিন শুধু পানি খেয়ে কাটিয়ে দিত সে। প্রতিবেশীরা এসব জানতে পেরে ওর শ্বশুরাড়ির লোকদের নজর এড়িয়ে মধ্যরাতে

এক বাটি খাবার দিয়ে যেত। তাই দিয়ে হত ক্ষুধা নিবারন।আবার ভোর হবার আগেই তারা সেই বাটি ফেরত নিয়ে যেত। সেই সময়ে ওর স্বামীর সংসারে আয় না থাকায় ওকে মানসিক সাপোর্ট দিলেও এসব বিষয়ে কিছুই করতে পারতেন না। এভাবেই কঠিন সংগ্রামের সংসার করে সোনালি বিজ্ঞান বিভাগ হতে ৪.৪০ পয়েন্ট নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে। এরপরে কোনপ্রকার কোচিং প্রাইভেটে না পড়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধে জয় লাভ করে ও। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেবার সুযোগ যদিও

হয়নি । তবুও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করে। তখন শ্বশুর বাড়ি হতে কোনভাবেই ওকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দেওয়া হয় না। কারন হিসেবে বলা হয়, ঘরের বউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে সে নষ্ট হয়ে যাবে। অগত্যা ভর্তি হতে হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত আমাদের গাইবান্ধা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগে। (তবে তখন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আজ আমি আর ওকে দেখার বা ওকে নিয়ে কিছু লেখার সুযোগ আজ পেতাম না) শুরু হল আবার নতুন

যুদ্ধ। সেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে গাইবান্ধা শহরে এসে ক্লাস করা এবং বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় প্রাইভেট পড়তেই হত। তখন আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর আব্দুর রশিদ স্যার ও আহম্মদ্দউদ্দিন কলেজ এর প্রভাষক সনৎ সিংহ গোস্বামী গোরা স্যারের কাছেই আমরা ইংরেজি সাহিত্যের রস বুজতে শুরু করি। সোনালি ও আমাদের সাথে যোগ দেয় যদিও তখন জানতাম না যে ও কি পরিমান লড়াই করে আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে পড়ালেখাটা করছে। তবে প্রথম থেকেই একটা বিষয় লক্ষ্য করতাম ও

অন্যান্যদের থেকে পড়ালেখায় একটু বেশিই সিরিয়াস।(তখন এটা নিয়ে আমরা মজাও করতাম) আর ওদিকে কলেজে ভর্তি হবার পরপরেই ওর বাবা পাড়ি জমান ওপাড়ে। দেখে যেতে পারলেন না তার সোনালির সোনালি সাফল্যময় দিনগুলি। সোনালির স্বামী মোশাররফ ভাই প্রায় প্রতিদিন ওকে প্রাইভেটে নিয়ে আসত আবার নিয়ে যেত।এরপরে একমাত্র সম্বল ওর শখের জিনিস হাতের স্বর্ণের আংটি বিক্রির টাকা দিয়ে ২য় বর্ষে থানাপাড়ায় একটা মহিলা মেসে সোনালি থাকতে শুরু করে। সেই

মেসেই রুমমেট মাস্টার্সে পড়ুয়া দিব্যি আপুর সাথে পরিচয়। ঔ আপু তখন বিসিএস এর প্রিপারেশন নিচ্ছিলেন। ওনার সাথে সাথে সোনালিও পড়া শুরু করে। এরপরে বিসিএস গ্রুপ ডিসকাসন নামের একটা বিসিএস কোচিং গাইবান্ধায় শুরু হলে সেখানে ও ক্লাস করতে শুরু করে। সেখানে রতন নামে একজন স্যার ক্লাস নিতেন তিনি কারমাইকেল কলেজ হতে পড়ালেখা করে ৩১ তম বিসিএস এ শিক্ষা ক্যাডার হয়েছিলেন। রতন স্যারের ক্লাসে তার কথা শুনে সোনালির মনে নতুন এক স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়,

ক্যাডার হবার স্বপ্ন। ওর মনে হয় স্যার যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ক্যাডার হতে পারেন আমিও পারব। তখন আমরা সবাই কলেজে ক্লাস করা, প্রাইভেট পড়া, ২/১ টা টিউশনি করতাম আর বাকি সময় কাটাতাম আড্ডা আর ঘোরাঘুরি করে। আর তখন সোনালি শুরু করে কঠোর পরিশ্রম ডিপার্টমেন্টের পড়ালেখার পাশাপাশি বিসিএস এর পড়ালেখা। ফলে অর্নাস ৩য় বর্ষে পড়ার সময় ২০১২ সালে প্রাখমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে প্রথমবারেই সফল। প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থেকে

স্বামী সংসার সামলিয়ে অনার্সে ডিপার্টমেন্ট ফার্স্ট হয়ে অর্নাস শেষ করে। আর অন্যদিকে বিসিএস জব একাডেমি গাইবান্ধা তে নোমান ভাইয়ের কাছে বিসিএস এর প্রস্তুতি। অর্নাসের রেজাল্টের আগেই প্রকাশিত হয় ৩৫ তম বিসিএস এর বিজ্ঞপ্তি এবং আমরা এ্যাপিয়ার্ড হিসেবে মজা করে আবেদন করি সেই বিসিএসে। কিন্তু সোনালির কাছে বিসিএস কোন মজা ছিল না; ছিল স্বপ্নের আরেক নাম। তো এ্যাপিয়ার্ড দিয়ে ১ম বিসিএসে অংশগ্রহন করেই পাস করে প্রিলি, লিখিত এবং ভাইভা সোনালি। কিন্তুু

ভাগ্যে জোটে নন-ক্যাডার ১০ গ্রেডের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (বর্তমানে কর্মরত)। আর অন্যদিকে ৩৫ তম বিসিএস এর ভাইভার ২৫ দিন পূর্বে ওর কোল উজার করে আসে একমাত্র ছেলে সন্তান। আর তার পরপরেই ছিল আমাদের মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা। এরপরের গল্পটা স্বপ্ন পূরনের জন্য অন্য এক লড়াইয়ের গল্প। সংসার, চাকুরী সাথে দুধের বাচ্চা সামলিয়ে ৩৬ বিসিএসের সব বাধাঁ অতিক্রম করেও বিসিএস ক্যাডার হবার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়, আবারো নন-ক্যাডার। তবে সোনালি

হেরে যাবার পাত্রি না। আবারো ৩৭ বিসিএস এর সকল বাধাঁ অতিক্রম করে সোনালি। ততদিনে ৩৫ তম বিসিএসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট সিলেটে কর্মরত। সেই মহেন্দক্ষণ চলে আসে ৩৭ তম বিসিএসের ফলাফলের দিন। এবার বিধাতা আর হতাশ করেনি ওকে ১৪৫ তম হয়ে পছন্দের প্রথম ক্যাডার প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয় সোনালি। সোনালি বলে, ‘জীবনের লক্ষ্য সুস্থির রেখে পরিশ্রম করলে কোন বাঁধাই আর বাঁধা থাকেনা।’ সোনালিকে দেখে একটা কথাই মনে হয় স্বপ্ন পুরনের পথে কোন বাধাঁই আসলে বাধাঁ নয়। একমাত্র বাধাঁ আমরা নিজেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *