করোনাভাইরাস: ‘রাতারাতি আমাদের পুরো বাড়ি হাসপাতাল হয়ে গেল’

ভারতে যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে নতুন করোনাভাইরাস কী অনন্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছে, তা উত্তর-পশ্চিম দিল্লির একটি পরিবারের চিত্র থেকে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে।

১৭ সদস্যের গার্গ পরিবারের সদস্য মুকুল গার্গ তার নিজের ব্লগে এই চিত্র তুলে ধরেছেন। তার ওই ব্লগ এরই মধ্যে শত শত পাঠকের নজর কেড়েছে; অনেকে মন্তব্যও করেছেন বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

নিজের ব্লগে মুকুল লিখেছেন, “বাইরের কারও সঙ্গে মিশিনি আমরা; কেউ আমাদের বাড়িতেও আসেনি। এরপরও করোনাভাইরাস আমাদের ঘরে ঢুকে যায় এবং একের পর এক সদস্যকে আক্রান্ত করে।”

ঘটনার শুরু মুকুলের ৫৭ বছর বয়সী এক চাচাকে দিয়ে।

২৪ এপ্রিল চাচা যখন জ্বরে পড়লেন, তখনও খুব বেশি দুশ্চিন্তার কিছু দেখেননি মুকুল। কিন্তু এর দুই দিনের মধ্যে তাদের পরিবারের আরও দুইজন অসুস্থ হয়ে পড়েন।

অসুস্থদের গায়ের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, কণ্ঠস্বর ফ্যাঁসফ্যাঁসে হতে থাকে, কাশির সঙ্গে কফ- উপসর্গগুলো নতুন করোনাভাইরাসের লক্ষণের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল, তারপরও তা স্বীকারে অনীহা ছিল মুকুলের, একে মৌসুমি ফ্লু বলেই ভাবতে চাইছিলেন তিনি।

“একসঙ্গে ৫-৬ জন অসুস্থ হয়ে যাওয়া এই বাড়িতে নতুন কিছু নয়, আতঙ্কের কিছু নেই,” নিজেকে এভাবেই প্রবোধ দিচ্ছিলেন তিনি।

পরের কয়েকদিনে বাড়ির আরও ৫ জনের দেহে কোভিড-১৯ এর উপসর্গ দেখা দেয়। এভাবেই গার্গ পরিবারে একজনের দেহ থেকে অন্যজনে ভাইরাস ছড়াতে থাকে। পরে পরীক্ষায় পরিবারটির ১৭ সদস্যের মধ্যে ১১ জনের দেহেই করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

সংক্রমণ প্রতিরোধে ভারত সরকার ২৫ মার্চ থেকে যে কঠোর লকডাউন দিয়েছিল, তা জুনের শুরু পর্যন্ত বহাল ছিল। বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণকে ঘরে রাখা, ব্যস্ত সড়ক ও ভিড়ঠাসা স্থান থেকে দূরে রাখা।

কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টা অন্যরকম। দেশটির ৪০ শতাংশ পরিবারে বহু প্রজন্মের বাস; বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এক ছাদের নিচেই তিন কি চারজন থাকেন। যার কারণে বাড়িঘরগুলোকেই জনবহুল স্থান হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

বাড়ির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও ঝুকিপূর্ণ; কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, বদ্ধ ঘরেই ভাইরাস বেশি সংক্রমিত হয়।

“পরিবারের একজন যে মুহূর্তে আক্রান্ত হন, তখন থেকেই লকডাউনে থাকা পরিবার ক্লাস্টারে পরিণত হওয়া শুরু করে,” বলেছেন ভাইরোলজিস্ট জ্যাকব জন।

যেমন বলছেন মুকুল, “যখন লকডাউনের কারণে পরিবারটি এমনিতেই বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, তখন বড় পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা মেনে চলা সম্ভব হয় না।”

গার্গ পরিবারের তিন তলা বাড়িটির উপরের তলায় ৩৩ বছর বয়সী মুকুলের সঙ্গে তার ৩০ বছর বয়সী স্ত্রী, ৬ ও ২ বছর বয়সী দুই সন্তান এবং মুকুলের বাবা-মা ও দাদা-দাদি থাকেন। নিচের দুই তলায় মুকুলের চাচারা তাদের পরিবার নিয়ে থাকেন ।

গার্গ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চার মাস বয়সী শিশুও যেমন আছে, তেমনি ৯০ বছর বয়সী শয্যাশায়ী বৃদ্ধও আছেন।

অনেক পরিবারে যেখানে একেকটি কক্ষেই অনেক সদস্যকে থাকতে হয়; একই গোসলখানা ভাগ করে নিতে হয়; সে তুলনায় গার্গদের বাড়িটিকে বিশালই বলা চলে। বাড়ির প্রতিটি তলায় জায়গা প্রায় আড়াইশ স্কয়ার মিটার, টেনিস কোর্টের প্রায় দ্বিগুণ। আছে তিনটি করে শোবার ঘর, বড় বড় গোসলখানা ও কিচেন।

এরপরও এ পরিবারটিতে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়েছে, প্রতিটি তলা ভ্রমণ করেছে, বাড়ির প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ককেই আক্রান্ত করেছে।

গার্গরা অবশ্য তাদের বাড়ির প্রথম সংক্রমিত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘পেশেন্ট জিরো’ হচ্ছেন মুকুলের এক চাচা, যদিও তার কাছে ভাইরাস কীভাবে এসেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

“হতে পারে কোনো সবজি বিক্রেতা কিংবা মুদি দোকানের কারও কাছ থেকে এটি এসেছে; কেননা পরিবারের কোনো কোনো সদস্য কেবল সে সময়গুলোতেই বাড়ির সীমানার বাইরে যায়,” বলেছেন মুকুল।

এরপর ভাইরাসটি যখন একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, আতঙ্কের পাশাপাশি লজ্জাও যেন যুগপৎ তাদেরকে ঘিরে ধরছিল।

“আমরা ১৭ জন, এরপরও নিজেদের একা মনে হচ্ছিল। সমাজে করোনাভাইরাস নিয়ে যে কুসংস্কার, তাতে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল- যদি আমাদের কিছু হয়ে যায়, তাহলে কেউ কি শেষকৃত্যে আসবে?,” লিখেছেন মুকুল।

মে-র প্রথম সপ্তাহে গার্গের ৫৪ বছর বয়সী চাচি যখন শ্বাস নিতে সমস্যার কথা জানান, তখনই পরিবারের সবাইকে হাসপাতালে ছুটতে হয়। করোনাভাইরাস শনাক্তে পরীক্ষা করানোর কথা বুঝতে পারেন তারা, বলছেন মুকুল।

ওই পুরো মে মাস ধরেই গার্গ পরিবারকে ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে হয়েছে।

মুকুল জানান, এ সময় তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন। পরিবারের সদস্যরা হোয়াটস অ্যাপে একে অপরের খোঁজখবর নিয়েছেন।

“উপসর্গ অনুযায়ী পরিবারের সদস্যদের অবস্থান বদলেছি আমরা, যেন জ্বর আক্রান্ত দুইজন একই ঘরে না থাকেন,” গার্গ পরিবারের আক্রান্ত ১১ সদস্যের মধ্যে ৬ জনের অন্যান্য সমস্যা যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ থাকায় তাদের ঝুঁকি ছিল আরও বেশি।

“রাতারাতি আমাদের বাড়ি পরিণত হল কোভিড-১৯ এর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে আমাদেরই পালা করে নার্সের ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল,” বলেন মুকুল।

ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃহৎ পরিবারগুলো ভাইরাসের অন্য ক্লাস্টারগুলোর মতোই হয়ে ওঠে, পার্থক্য দেখা দেয় কেবল বয়সে।

“যখন একই স্থানে নানা বয়সী মানুষ থাকে তখন সবার ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সমান থাকে না, বেশি বয়সীদের ঝুঁকি বেশি থাকে,” বলেছেন ভাইরোলজিস্ট ড. পার্থ সারথী।

এ কারণেই মুকুল তার ৯০ বছর বয়সী দাদাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু এ ভাইরাস, বিশ্বজুড়ে অসংখ্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গার্গদের জন্যও বিস্ময় নিয়ে হাজির হয়।

দেখা যায়, ৯০ বছর বয়সী এ বৃদ্ধও মুকুল আর তার স্ত্রী-র মতোই ‘উপসর্গবিহীন আক্রান্ত’। পরিবারের যে সদস্যকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল, তার ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপজনিত কোনো সমস্যাই ছিল না। আর যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের উপসর্গও ছিল যৎসামান্য।

মুকুল বলছেন, তিনি ব্লগটি লিখেছেন সেসবকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য, যারা আক্রান্ত হওয়ার পরও সাহায্য চাইতে দ্বিধা করছেন।

“শুরুর দিকে, মানুষ কী ভাববে, তা নিয়ে আমরা বেশি চিন্তা করতাম। এখন এতোসব মন্তব্য পড়ে ভালো লাগছে, যেখানে মানুষজন বলছে, আক্রান্ত হয়েছ তো কী হয়েছে, এ নিয়ে লজ্জার কিছু নেই,” বলেছেন তিনি।

পরিবারের আক্রান্ত সদস্যদের উপসর্গ একে একে চলে গেলে মে-র দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মুকুলদের দুশ্চিন্তা দূর হতে থাকে । এ দফায় শনাক্তকরণ পরীক্ষাগুলোতে ‘নেগেটিভ’ ফলের আধিক্য দেখা যায়।

‘নেগেটিভ’ ফল নিয়ে মুকুলের চাচি হাসপাতাল ছাড়লে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। খারাপ সময় শেষ পর্যন্ত বিদায় নিয়েছে বলে বুঝতে পারেন তারা।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব আর সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ থাকলেও ভারতের যৌথ পরিবারগুলো মূলত পরিবারের সদস্যদের একে অপরের প্রতি সহযোগিতা ও যত্নের অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে। করোনাভাইরাসের এ দুঃসময়ে এই যৌথ পরিবারগুলো এমনকি ত্রাণকর্তা হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে।

Author: Online Editor

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *